আজ তেহরানের আকাশে আগুন: ইসরায়েলের হামলায় ইরানের দুই শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিহত

১৫ মার্চ ২০২৬। তেহরানের আকাশে আবার আগুনের আলো দেখা গেল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (IDF) জানিয়েছে, তেহরানে চালানো লক্ষ্যভিত্তিক বিমান হামলায় ইরানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছে।

নিহত কর্মকর্তারা হলেন মেজর জেনারেল আবদুল্লাহ জালালি-নাসাব এবং কর্মকর্তা আমির শরিয়াত। তারা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ গোয়েন্দা ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং তেহরানেই হামলার লক্ষ্য হন।

এর আগেও একই ইউনিটের উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালেহ আসাদি ইসরায়েলের প্রথম দফার হামলায় নিহত হয়েছিলেন।

ফলে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক গোয়েন্দা কাঠামোর ওপর ধারাবাহিক আঘাত পড়ছে।

হামলার কিছুক্ষণ পর ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে। লোদ শহরে আগুন লাগে এবং বেনেই ব্রাক এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ পড়ে।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে বলে জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ১০ হাজারের বেশি বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং ৭,৬০০টির বেশি হামলা চালানো হয়েছে।

এর মধ্যে প্রায় ৪,৭০০ হামলা সরাসরি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং অস্ত্র অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।

সামরিক সূত্রের দাবি, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ ইরানি সেনা ও কমান্ডার নিহত হতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের নৌ-মাইন সক্ষমতা ধ্বংসে অভিযান বাড়িয়েছে, যাতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী নিরাপদ থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তেহরান থেকে ভূমধ্যসাগর—সবাই বুঝতে শুরু করেছে, এই সংঘাত এখনো শেষ নয়; বরং এর পরবর্তী অধ্যায় শুরু হতে পারে যেকোনো সময়।

ইরানের পতন কি তাহলে প্রহর গুনছে?

ইরান আসলে ইসরাইলকে চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছিল। তবে কি ইরান নিজেই মুছে যেতে চলেছে?

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনো কেন শুরু হয়নি জানেন?

কারণ পৃথিবীতে এমন একটি বাস্তবতা আছে যা শুনতে চমকে ওঠে। আপনিও চমকে উঠতে পারেন।

আসলে যে অস্ত্র মানুষকে শেষ করতে পারে, সেই অস্ত্রই এখন পৃথিবীকে বড় যুদ্ধ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

কি শুনতে অদ্ভুত লাগে?

অদ্ভুত লাগলেও বিষয়টা বাস্তব সত্যি।

আধুনিক বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতাগুলোর একটি ঠিক এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

আজ পৃথিবীতে কয়েকটি রাষ্ট্র আছে, যাদের হাতে এমন অস্ত্র রয়েছে যা কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি শহরকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে পারে।

একাধিক দেশ যদি একই সঙ্গে এই অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে শুধু শহর নয়—মানবসভ্যতার ভবিষ্যতই অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।

এই ভয়ংকর বাস্তবতা থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ধারণা তৈরি হয়, Mutually Assured Destruction।

শব্দগুলো শুনতে সাধারণ, কিন্তু অর্থ ভয়াবহ।

যদি দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউই বাঁচবে না।

কারণ এক দেশ আঘাত করলে অন্য দেশও পাল্টা আঘাত করবে। আর সেই পাল্টা আঘাতের পর আবার প্রতিশোধ। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই ধ্বংস হয়ে যাবে।

অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু করলেই নিজের দেশকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।

এই কারণেই বড় শক্তিগুলো যতই একে অপরকে হুমকি দিক, শেষ মুহূর্তে তারা সাধারণত থেমে যায়।

এই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল Cold War সময়।

তখন পৃথিবীর দুই পরাশক্তি ছিল United States এবং Soviet Union।

তাদের মধ্যে ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতা ছিল। হাজার হাজার পারমাণবিক বোমা তৈরি হয়েছিল। তবুও তারা সরাসরি যুদ্ধ করেনি।

কারণ তারা জানত, একবার সেই যুদ্ধ শুরু হলে পৃথিবীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

তাই যুদ্ধ হয়েছে অন্যভাবে।

ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, কোরিয়া—এসব জায়গা হয়ে উঠেছিল বড় শক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধের মঞ্চ।

আজও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, ইউরোপে যুদ্ধ, এশিয়ায় শক্তির প্রতিযোগিতা—সবই চলছে।

তবুও বড় শক্তিগুলো এখনো সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করতে ভয় পায়।

এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক এটাকে বলেন “Nuclear Deterrence” বা “Nuclear Peace”—যেখানে যুদ্ধের ভয়ই বড় যুদ্ধকে থামিয়ে রাখে।

পৃথিবীর ইতিহাসে হয়তো এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত বাস্তবতা।

মানবজাতির সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রই এখন পর্যন্ত মানবজাতিকে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ থেকে দূরে রেখেছে।

কিন্তু প্রশ্নটা এখনো রয়ে গেছে, এই ভারসাম্য কতদিন টিকবে? ইরানের প্রশ্নে বিষয়টি আলাদা হতে পারে বলে অনেকেই আশংকা প্রকাশ করছে।

কেমন চলছে ইসরায়েল–আমেরিকা আর ইরান যুদ্ধ?

এই যুদ্ধকে দূর থেকে দেখা খুব সহজ। সামাজিক মাধ্যমে কেউ ইরানের পক্ষে স্লোগান দেয়, কেউ আবার ইসরায়েলকে দোষ দেয়, কেউ আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলে।

কিন্তু যুদ্ধকে যারা কাছ থেকে দেখে তারা জানে যুদ্ধ কোনো স্লোগান নয়। যুদ্ধ মানে আকাশে গর্জন, মাটিতে বিস্ফোরণ, আর শহরের পর শহর ধ্বংস হয়ে যাওয়া। মৃত্যু আর হাহাকার।

অনেকেই আমরা উপলব্ধি করতেই পারছি না কেমন চলছে এই যুদ্ধ। আমরা শুধু যে যাকে সমর্থন করছি তার গুনগান করছি। প্রকৃত যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি থেকে আসলে আমরা যোজন যোজন দূরে। তাই প্রকৃত পক্ষে কি হচ্ছে সেখানে তা বোঝাতে এই পোস্ট লিখার চেষ্টা করছি।

আজকের যুদ্ধ আগের যুগের যুদ্ধ নয়। এখন যুদ্ধ মানে শুধু বন্দুক বা ট্যাংক নয়। এখন যুদ্ধ মানে স্যাটেলাইট, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রযুক্তি এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে পরিচালিত নির্ভুল মিসাইল।

সোজা করে লিখবো।

শক্তির দিক দিয়ে আমেরিকা সুপারপাওয়ার সেটা মানি আর নাই মানি আমেরিকা কিন্তু সুপারপাওয়ার। সুপারপাওয়ার আমরা সহজে বলি কিন্তু বুঝতে চেষ্টা করি না সুপারপাওয়ার কি।

সুপারপাওয়ার মানে শুধু বড় সেনাবাহিনী না। সুপারপাওয়ার মানে এমন প্রযুক্তি যার মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসেও একটি দেশের সামরিক ঘাঁটি বা কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করা যায়। সুপারপাওয়ার মানে এমন নজরদারি ব্যবস্থা যা স্যাটেলাইট থেকে প্রতিটি চলাচল দেখতে পারে।

শুধু এইটুকু বলি, জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকি শহরে কোন সালে বোমা মেরেছিল? এখন ২০২৬ সাল। তাহলে কত বছর আগে আমেরিকা এই বোমা আবিষ্কার করেছিল? অথচ ইরান এখনো বানাতে পারে নি। তাহলে কত আগ্রসর আমেরিকা?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছিল সেটি ছিল ৮০ বছর আগের প্রযুক্তি। আজকের প্রযুক্তি সেই সময়ের তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী। এখন একটি মিসাইল হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে উড়ে এসে একটি নির্দিষ্ট ভবন বা ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত করতে পারে।

আরেকটা ছোট্ট ইঙ্গিত দিই। ইসরায়েলের কি পারমাণবিক বোমা নেই মনে করেন? যেহেতু তথ্য নেই তাই আমি ইসরায়েলের পারমাণবিক বোমা আছে বলতে পারি না। কিন্তু ইচ্ছে হয় সত্যিটা বলি। ইসরায়েলের কোন অস্ত্র নেই? কোন প্রযুক্তি নেই?

বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক সময় কিছু বিষয় প্রকাশ্যে বলা হয় না। অনেক সামরিক শক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করা হয় না। কিন্তু গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং সামরিক পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিক দিয়ে ইসরায়েল পৃথিবীর অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র।

দুই পরাশক্তি আমেরিকা আর রাশিয়ার সমস্ত অস্ত্র এবং প্রযুক্তি কারা বানিয়েছে একটু গুগল করে দেখুন। ইহুদি আর খ্রিস্টান ছাড়া অন্যরা যে বানায়নি তা বলছি না। কিন্তু তুলনা করলে নিতান্ত নগণ্য বলতে হয়। আর ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের অনেক সূত্র থেকে তারা সেই পথে এগিয়েছে।

আধুনিক যুদ্ধের আরেকটি বড় শক্তি হলো গোয়েন্দা তথ্য। কোন শহরে কোন সামরিক ঘাঁটি আছে, কোথায় অস্ত্র মজুদ, কোথায় কমান্ড সেন্টার — এসব তথ্য অনেক সময় মাসের পর মাস ধরে সংগ্রহ করা হয়। তারপর একদিন নির্দিষ্ট মুহূর্তে হামলা চালানো হয়।

আপনার হাতের যে মোবাইল আছে সেটা মুহূর্তে বোমা হয়ে ফুটে যেতে পারে আর আপনি সেখানে শেষ। আপনার সামনে যে কম্পিউটার আছে সেটাও বোমা হতে পারে আর আপনি মুহূর্তে শেষ। কারণ যে কম্পিউটারের সফটওয়্যার আছে সেখানে কি আছে আপনি জানেন না। সেটা তারা বানিয়েছে। সুপারপাওয়ার শুধু বোমায় নয়, প্রযুক্তিতেও। হিজবুল্লাহদের ওয়াকিটকি ফুটে হিজবুল্লাহ নেতা মারা গিয়েছিল মনে আছে?

লেবাননে হিজবুল্লাহর যোগাযোগ যন্ত্র বিস্ফোরণের ঘটনাটি অনেক বিশ্লেষক আধুনিক প্রযুক্তিগত যুদ্ধের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা যায় যুদ্ধ এখন শুধু মাটিতে নয়, প্রযুক্তির ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে।

আর বর্তমান যুদ্ধ?

শত শত বিমান উড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। দিনে রাতে ফুটছে। ধসে পড়ছে শত শত বিল্ডিং। খবর অনুযায়ী IRGC সদস্যদের জন্য হাসপাতাল এবং মর্গ ভরে গেছে। রাখার আর জায়গা নেই। যে বোমা ফেলা হচ্ছে ইরানে একটিও আটকানো যাচ্ছে না। কারণ সে ক্ষমতা ইরানের নেই। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

IRGC বা Islamic Revolutionary Guard Corps ইরানের একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। এটি শুধু সেনাবাহিনী নয়, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর একটি বড় অংশ। তাই এই বাহিনীর ঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার এবং অস্ত্রভাণ্ডার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে সেটি একটি বড় সামরিক আঘাত হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে ইরানও হামলা করছে বটে। কিন্তু শত শত বিমান এই রকেট অর্ধেক পথে আটকাচ্ছে। আইরন ডোম আটকাচ্ছে। এখন আইরন ডোম তো আর উন্নত। তবে কিছু কিছু এসে ইসরায়েলে পড়ছে। মানুষও মরছে। কিন্তু ইরানের তুলনায় নগণ্য বলা যায়।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহু স্তরের। আইরন ডোম স্বল্পপাল্লার রকেট আটকায়। অন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাঝারি ও দূরপাল্লার মিসাইল ধ্বংস করে। তাই অনেক সময় রাতের আকাশে মিসাইল আকাশেই বিস্ফোরিত হয় এবং আগুনের রেখা দেখা যায়।

যুদ্ধ যদি এক মাস দীর্ঘ হয় তাহলে ভিন্ন রূপ পাবে। ভয়াবহতা বাড়বে। তখন হয়তো IRGC সদস্যরাই লক্ষ্য হবে না। ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। হয়তো সূর্যের আলো দেখা অনেক শহরের মানুষের হবে না। কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢাকা থাকবে।

যুদ্ধ দীর্ঘ হলে প্রথমে সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়। তারপর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেল শোধনাগার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেতু — সব লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তখন একটি শহরের জীবন থেমে যায়। মানুষ বাঙ্কারে আশ্রয় নেয়। রাতের আকাশে আগুনের আলো দেখা যায়।

এটাই যুদ্ধের বাস্তবতা। দূর থেকে আমরা শুধু স্লোগান দেখি। কিন্তু যে মানুষ সেই আকাশের নিচে থাকে তার কাছে যুদ্ধ মানে প্রতিটি রাত একটি অনিশ্চিত রাত।

একটি সাইরেন বাজে। মানুষ দৌড়ে আশ্রয়ে যায়। তারপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।

তারপর বিস্ফোরণ।

মাটি কেঁপে ওঠে।

তারপর আবার নীরবতা।

এই নীরবতার মাঝেই মানুষ অপেক্ষা করে পরের বিস্ফোরণ কোথায় হবে সেই দুচিন্তায়।

দুই রাজার দুই ছবি। পার্থক্য কি?

ছবি দুটি এই সপ্তাহের ভাইরাল ভিডিও ক্লিপ থেকে স্ক্রীনশট নিয়েছি। ছবির দুই জনই আমার খুব প্রিয়। আমি তাদের ভক্ত। সন্মান এবং শ্রদ্ধা করি।

দুটি ছবিই বলে দিচ্ছে দুই রাজার বর্তমান অবস্থান। একটা বীরত্বের আর আরেকটা .. বলতে পারছি না। খুব দ্বিধা বোধ করছি। বলতে পারলে তৃপ্তি পেতাম। পারছি না।

এই দ্বিধাবোধ হওয়ার কারণ আমাদের চাকমা রাজা মহাশয় দায়ী নন। আমরা দায়ী। তাকে আমরা এই অবস্থায় ফেলে দিয়েছি। লজ্জাবোধ আমাদের থাকা উচিত।

ঘরে সম্মান দিলে বাইরে সম্মান থাকে। আজ তিনি অন্য রাজ্যে গিয়ে নিজের রাজ সম্মান ভুলে সমস্যার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। চাকমাদের দুর্বলতা বেরিয়ে এল। এই দুর্বলতা কি বীরত্বের?

গলা কাটা বীরত্ব।

রাজাবাবুর সমাধান মেনে নিলে আজ সব সমাধান হত। অনেকে মেনে নিতে পারে নি। রায় যে হোক না কেন ত্যাগের নামে বিভাজন কাম্য নয়।

জাতির আজ মৃত্যুর পরে কী হবে, তার চেয়ে কিভাবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখবে—সেই বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অথচ আজ অলীক কিছু নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করে জাতি নিজের রাজাকে পর্যন্ত পরের কাছে মাথা নত করে অসহায়ত্ব দেখাতে বাধ্য করছে।

মৃত্যু থেকে কেউ ফিরে এসেছে? স্বর্গ থেকে কেউ ফিরে এসেছে? নরক থেকে কেউ ফিরে এসেছে? তাহলে এ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি কেন?

ধর্ম প্রয়োজন। তবে ধর্ম প্রয়োজন যখন একটি জাতি শান্তিতে থাকে। যখন অস্তিত্বের সঙ্কট থাকে না তখন ধর্ম লাগে। অস্তিত্ব যেখানে সঙ্কটে সেখানে ধর্ম একটি অলিক বিষয়।

আজ আমাদের রাজা যাদের দ্বারা বিদেশের মাটিতে নিজের মাথা নত করছেন তারা কি তার মত শিক্ষিত? আমরা যদি একজন অশিক্ষিত মানুষের ভ্রান্ত কথায় চলি তাহলে এত কষ্ট করে এত লেখাপড়া করার দরকার কি?

পাহাড়ে অনেক শিক্ষিত আছেন তারাও আজ এই বেড়াজালে মত্ত। আমার আফসোস হয় তাহলে আপনারা এত বছর শিক্ষায় অপচয় করলেন কেন যদি যারা কিছু পাস করে নি তাদের কথায় চলেন?

অনেকে বলে বনদের এসব বিষয় ঠিক নয়। তাহলে বয়কটের ডাক দেন না কেন? যা ঠিক নয় তা নিজেও বর্জন করা এবং সমাজকে বুঝানো দরকার যে এটা ঠিক নয়।

অনেক বলার আছে। কিন্তু শেষ হবে না। তবে এটুকু বলে রাখি, মিয়ানমার বা থাইল্যান্ড থেকে এসে আমাদের সমস্যা সমাধান করে দিতে পারবে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে সিদ্ধান্ত আসুক না কেন পাহাড়ের সমাজ যদি শক্ত পদক্ষেপ না নেয় বরাবর সেই সমস্যা থাকবে। সিদ্ধান্ত যে দলের বিপক্ষে যায় সে দল বলবে তারা সেই রায় মানে না।

এজন্য পাহাড়ের সমাজকে এ বিষয়টি নিজেদেরই সমাধান টানতে হবে।

দয়া করে, নিজেদের রাজাকে পরের দেশে এভাবে আর যাতে মাথানত করতে না হয় সে বিষয়ে সতর্ক হন। আমাদের রাজাও যেন বিদেশে গর্ব করে কথা বলতে পারে সে বিষয়ে আমাদের মনযোগী হতে হবে।

ত্রিপুরা মহারাজা থেকে শিখুন। ত্রিপুরা রাজ্যের লোক থেকে শিখুন কিভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। ধর্ম নয় ঐক্য, স্বর্গ~নরক নয় অধিকারই বেঁচে থাকার একমাত্র সাধনা 🙏

মহাকাশ ছুঁয়ে নামল আগুন: তেহরানে এক হামলায় কাঁপল ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র

শনিবার সকালে তেহরানের আকাশ ছিল শান্ত। শহরের মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আকাশ থেকে নেমে এলো এমন এক আগুন, যা মুহূর্তের মধ্যে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রকে কাঁপিয়ে দিল।

৫ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন পত্রিকা New York Post দাবি করেছে, এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল “ব্লু স্প্যারো” নামে একটি বিশেষ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। এটি প্রথমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে উঠে প্রায় মহাকাশের সীমানা ছুঁয়ে যায়, তারপর ভয়ংকর গতিতে আবার নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কম্পাউন্ড। তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিট এলাকায় অবস্থিত এই কম্পাউন্ড বহু বছর ধরেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

খবরে বলা হয়েছে, এই আক্রমণ ছিল একটি বড় সামরিক অভিযানের অংশ। হামলার শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ পশ্চিম ইরাক পর্যন্ত গিয়ে পড়েছিল বলে ইসরায়েলি সূত্র দাবি করেছে।

প্রতিবেদন আরও বলছে, এই হামলার পরিকল্পনা হঠাৎ করে করা হয়নি। বরং এটি দীর্ঘদিনের গোপন প্রস্তুতির ফল। হামলার আগে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন যাতে মনে হয় সেনাবাহিনী সপ্তাহান্তে বিশ্রামে যাচ্ছে।

এমনকি কিছু ছবি ও তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল যেখানে দেখা যায় অনেক কর্মকর্তা শাবাতের ডিনারের জন্য বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে সেই কর্মকর্তারাই পরে গোপনে আবার সদর দপ্তরে ফিরে এসে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

হামলার সময়ও শেষ মুহূর্তে বদলানো হয়। প্রথমে এটি রাতের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সময় পরিবর্তন করে শনিবার সকালে করা হয়, কারণ তখন তেহরানে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।

খবরে বলা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ খামেনি সাধারণত নিরাপত্তার কারণে গভীর ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে থাকতেন। তবে ওই সকালে তিনি নিজের কম্পাউন্ডেই উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

এই হামলার পেছনে গোয়েন্দা নজরদারির বড় ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে ওই কম্পাউন্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নজর রাখছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

কে কখন আসে, কোথায় নিরাপত্তা বাহিনী অবস্থান নেয়—এসব তথ্য নাকি নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছিল। আশপাশে বসানো একটি নজরদারি ক্যামেরাও নাকি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছিল।

এসব তথ্য তেলআবিবে পাঠানো হচ্ছিল যাতে হামলার সঠিক সময় নির্ধারণ করা যায়।

হামলার দিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ইসরায়েলের এফ-১৫ যুদ্ধবিমানসহ কয়েকটি বিমান আকাশে ওঠে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা পরে খামেনির কম্পাউন্ডের দিকে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, যার মধ্যে ব্লু স্প্যারোও ছিল।

ব্লু স্প্যারো মূলত এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উড়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে। প্রথমে এটি অনেক উঁচুতে উঠে, তারপর নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।

প্রতিবেদন আরও বলছে, হামলার সময় খামেনির কম্পাউন্ডের আশপাশের কয়েকটি মোবাইল ফোন টাওয়ারও অচল করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত কোনো সতর্ক বার্তা আদান-প্রদান করতে পারেনি।

একই সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পর্যবেক্ষণ কক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের ৪০ জনের বেশি কর্মকর্তা নিহত হন। তাদের মধ্যে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দোলরহিম মুসাভির নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও ওই হামলায় নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। তাদের আশঙ্কা ছিল, এসব কর্মসূচি ভবিষ্যতে অঞ্চলজুড়ে বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।

এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এর ফলে অঞ্চলের সংঘাত নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

নোটঃ Blue Sparrow একটি এয়ার-লঞ্চড মিসাইল, যা সাধারণত যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া হয়। এটি প্রথমে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে উঠে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রান্তে পৌঁছে যায়। এরপর এটি উচ্চগতিতে আবার নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। এই ধরনের মিসাইল মূলত শত্রুর ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

পাহাড় কি তার ভুলের ইতিহাস লিখতে প্রস্তুত?

পাহাড় কি তার ইতিহাস

গত তিন মাসে পাহাড়ের পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত যেন শেষের পথে। পাহাড়ে আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দল গঠিত হয়েছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই পাহাড় দু’বার গৃহযুদ্ধের মতো ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছে।

আর যেন তৃতীয়বার এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত পাহাড়কে দেখতে না হয়—জুম্ম জাতি সে বিষয়ে সজাগ থাকবে, এটা আমরা সবাই নিশ্চয়ই কামনা করি।

কিন্তু কিভাবে?

অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে। কিন্তু ইতিহাস না থাকলে আগামী প্রজন্ম শিখবে কীভাবে?

এই কারণেই ভাবছি, কিছু লেখা যায় কি না। কিন্তু এমন বিষয়ে লিখতে হলে তথ্য দরকার। আবেগ দিয়ে ইতিহাস লেখা যায় না।

চুক্তির পর এই সংঘাত কীভাবে শুরু হলো, নাকি তারও আগে থেকেই এর বীজ ছিল—এ বিষয়ে পাহাড়ের প্রায় ৯৯% মানুষই পরিষ্কারভাবে জানে না। আমি চেষ্টা করছি বিষয়টি অনুসন্ধান করার। কাউকে দোষী করা বা কাউকে ভালো প্রমাণ করার জন্য নয়। বরং সমস্যা কোথায় ছিল, ভুল-বোঝাবুঝি কেন তৈরি হলো, এবং কীভাবে সেই সংঘাত জন্ম নিল—এসব নিরপেক্ষভাবে শুনে ও বুঝে লিখতে চাই।

অনেকে আমাকে বলেছেন, এ বিষয়গুলো খোলাখুলি পোস্ট না করাই ভালো। তাদের কথা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এটাও তো সত্য যে পাহাড়ের ভ্রাতৃসংঘাত কোনো গোপন বিষয় নয়। সবাই জানে, সবাই দেখেছে। তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। আমার মনে হয় এই অধ্যায় শেষের দিকেই চলে এসেছে—এক কথায় বললে, শেষ হয়ে গেছে বললেও খুব ভুল হবে না।

যারা এখনো স্রোতের বিপরীতে আছেন, তাদেরও একসময় ফিরে আসতে হবে। মতপার্থক্য হয়, আবার সমাধানও হয়। আমাদের পাহাড়েও তেমনটাই হয়েছে। সময় ধীরে ধীরে অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয়।

কিন্তু তবুও এই ইতিহাস লিখে রাখা দরকার। কারণ ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য ইতিহাসের দরকার হয়।

পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ ইতিহাস আছে ইসরায়েলের ইহুদি জাতির। পুরো বাইবেলই মূলত তাদের ইতিহাসের একটি বড় দলিল। সেখানে তাদের ভুলও আছে, সঠিক সিদ্ধান্তও আছে—কিছুই লুকানো হয়নি। তাই তারা সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

পাহাড়ও যদি শুধু ভালো ঘটনাগুলো লিখে রাখে কিন্তু ভুলগুলো মুছে ফেলে, তাহলে ভবিষ্যতে আবার বড় সমস্যা হতে পারে। তাই ইহুদিদের মতোই আমাদের ইতিহাসেও সঠিক-ভুল সবকিছুই থাকা দরকার—যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

কিন্তু এই কাজ করতে হলে আপনাদের সবার সহযোগিতা দরকার।

এই বিষয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপ খোলার কথা ভাবছি। সেখানে হয়তো কিছু বিষয় খোলাখুলি লেখা যাবে না। সেক্ষেত্রে দয়া করে সরাসরি আমার ইমেইলে পাঠিয়ে দিতে পারেন।

অবশ্যই চাইলে আমাকে ফেসবুকেও মেসেজ দিতে পারেন।

Unfinished Peace: বিঝুর উপহার হোক পাহাড়ের ইতিহাস

Unfinished-peace
সামনে আর পিছনে বইটির কভার দেখা যাচ্ছে

এই এপ্রিলে আবার বিদেশের মাটিতে বিঝু উৎসব হবে। আমরা আদিবাসীরা একত্র হব, গান গাইব, নাচব, অতিথিদের আপ্যায়ন করব। স্থানীয় বন্ধুদের বলব পাহাড়ের কথা, আমাদের আন্দোলনের কথা, চুক্তির কথা, ভূমি-বিরোধের কথা।

কিন্তু কয়েক মিনিটের আলাপে কতটুকু বলা যায়?

পাহাড়ের ইতিহাস শত বছরের বিস্তৃত বাস্তবতা। সংঘাত কয়েক দশকের জটিল অধ্যায়। ১৯৯৭ সালের চুক্তি আজও একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন এক দিনের বক্তৃতায় শেষ করা যায় না।

এই কারণেই লিখেছি Unfinished Peace: Land, Power, and the Future of the Chittagong Hill Tracts Accord। বইটিতে ব্রিটিশ আমলের পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে সংক্ষেপ ও সহজ ভাষায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ইতিহাস, প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

এটি আবেগের বই নয়, অভিযোগের বইও নয়। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কাজ। এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে পাহাড়ের প্রশাসনিক ভিন্নতা, কাপ্তাই বাঁধ ও বাস্তুচ্যুতির প্রভাব, জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের রাজনৈতিক অভিঘাত, ভূমি কমিশনের কাঠামোগত সংকট, এবং কেন শান্তি আজও পূর্ণতা পায়নি।

আমরা প্রায়ই বলি, “পাহাড়ের চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি।”

কিন্তু আমরা কি কখনো ধৈর্য নিয়ে কাউকে ব্যাখ্যা করেছি—কেন বাস্তবায়ন হয়নি, কোথায় প্রক্রিয়া আটকে আছে, এর রাজনৈতিক অর্থ কী? কয়েক মিনিটের সাংস্কৃতিক বক্তৃতায় কি সেই বিশ্লেষণ সম্ভব?

এই বই সেই ব্যাখ্যার একটি পূর্ণাঙ্গ নথি।

বইটিতে রয়েছে—
ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক স্বাতন্ত্র্যের ইতিহাস;
রাষ্ট্র গঠনের পর কেন্দ্রীকরণের প্রভাব;
১৯৪৭-পরবর্তী জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের রাজনৈতিক ফলাফল;
১৯৯৭ সালের চুক্তির কাঠামো, শক্তি ও সীমাবদ্ধতা;
ভূমি কমিশনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ;
এবং সেই মৌলিক প্রশ্ন—শান্তি কি সত্যিই সম্পূর্ণ হয়েছে, নাকি এখনো একটি অসমাপ্ত প্রক্রিয়া?

তাছাড়াও আলোচনা আছে পাহাড়ে ভূমি ব্যবস্থার ঐতিহ্য, মালিকানার ধারণা, সেটলার আগমনের প্রেক্ষাপট, এবং আদিবাসী পরিচয়ের রাজনৈতিক অর্থ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পাহাড়কে বুঝতে যা প্রয়োজন তার একটি সুসংগঠিত ভিত্তি এখানে রয়েছে।

পার্বত্য চুক্তি নিঃসন্দেহে পাহাড়ের অধিকারের একটি ঐতিহাসিক দলিল। কিন্তু সেই দলিল কি আপনার কাছে সংরক্ষিত আছে? বইটির Appendix A-তে পুরো পার্বত্য চুক্তি সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি শুধু বিদেশি বন্ধুদের পড়ার জন্য নয়; এটি সংরক্ষণ করার মতো একটি নথি।

বিঝুতে আমরা অতিথিকে ফুল দিই, খাবার দিই, আন্তরিক আপ্যায়ন করি। এইবার একটি বই উপহার দিন যাতে তারা উৎসবের রঙের বাইরে গিয়ে পাহাড়কে বুঝতে পারে, আদিবাসীদের বাস্তব প্রশ্নগুলো উপলব্ধি করতে পারে।

মূল্য মাত্র ৭.৫০ ডলার। একটি সাধারণ আপ্যায়নের খরচের চেয়েও কম।

কিন্তু এর ভেতরে আছে আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনুসন্ধান। সহজলভ্য একটি বই, যার বিশ্লেষণ দীর্ঘস্থায়ী।

বিঝু শুধু উৎসব নয়। এটি স্মৃতি, পরিচয় এবং দায়িত্বের সময়।

তাই এই বিঝুতে পাহাড়ের ইতিহাসকেই উপহার দিন।

নোটঃ বইটি যে কোন দেশ থেকে Amazon থেকে সংগ্রহ করে নিন। লিঙ্ক নিচে দিলাম।বইয়ের নামে ক্লিক করুন (অথবা amazon-এ Purna Lal Chakma লিখে খুঁজে নিন)

Unfinished Peace: Land, Power, and the Future of the Chittagong Hill Tracts Accord

পুরুষের সৌন্দর্য বিপ্লবে প্রকাশিত হয়

আমার অনেক পাগলামি আছে। ছোটকাল থেকে অনেকে এজন্য আমাকে এক ধরনের পাগল বলে মনে করে। অবশ্যই আমি কখনো পরোয়া করি নি। এখনো করি না। অনেকে সখ বলে। তবে আমারগুলো নিঃসন্দেহে পাগলামি।

এরকম শত পাগলামির কয়েকটি হচ্ছে, বই পড়া, ভারত-রামায়নের গল্প শোনা, বৃষ্টির দিনে দৌড়ানো, সাইকেল চালা, বাইক চালা, শিকার করা, গহীন জঙ্গলে একাকী আনমনে ঘুরে বেড়ানো, পরিচয় গোপন করে হঠাৎ নতুন কোন জায়গায় দুয়েক দিন থাকা, মানুষের জীবনের গল্প শোনা, চুরির রহস্য উদ্ঘাতন করা।

আমি জানতাম না তখন এসব পাগলামি আসলে নিজের ভেতরের আগুন থেকে পালানোর সেরা পথ।

এসএসসি আমার রেজাল্ট খারাপ হল। আমি স্ট্যান্ড করতে পারি নি। স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। পাগলামি বেড়ে গেল।

মানুষ যখন হতাশ হয় রোগের উপসর্গ বেড়ে যায়। আমারও তাই হল। চট্টগ্রাম থেকে শরণার্থী শিবিরে ফিরে এলাম। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, বুন্ধু-বান্ধব সব বাদ দিলাম। কোথায় থাকি, কি করি, দিন নাকি রাত আমি কিছুই বুঝতে পারি না।

আমার ভিতরে তখন হতাশার শব্দগুলো ঘুরে বেড়াত—আমি কি অযোগ্য। আমি ব্যর্থ। আমার স্বপ্ন শেষ।

বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে দৌড় দিতাম। দুর্বল হলে হাঁটতাম। অনেকে পাগল বলে এসে দেখত। কিন্তু বছরে তো আর ৩৬৫ দিন বৃষ্টি হয় না। বর্ষা কয়েকমাস পর শেষ হয়।

দেড় বছর পর একদিন হঠাৎ মনে হল, আমি এভাবে আমি নিজেকে শেষ করছি কেন, আমি তো একা এর জন্য দায়ী নয়। আমার পরীক্ষায় আমাকে মানসিকভাবে নিপীড়ন করা না হলে আমি আমার লক্ষ্য অর্জন করতাম। অন্য দশ জনের মত আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয় নি। পরীক্ষাতে আমাকে আসামির মত ব্যবহার করা হয়েছিল।

সেদিন প্রথমবার মনে হল, অপমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোও এক ধরনের বিপ্লব আর এই বিপ্লব হচ্ছে বেঁচে থাকা।

যা ভাবা তেমন কাজ। ঠিক করলাম ১০ বছর আগে পরিচিত এক স্থানীয় রামায়ন রিয়াং দাদুর সাথে দেখা করবো। রামায়ন মুখস্ত পারতেন বলে লোকে তাকে রামায়ন দাদু বলে ডাকতো।

তার সাথে আমার রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। ছোটকালে তাকে আমার খুব আপন মনে হত। হেঁটে যেতে হয়। তিন ঘণ্টা পথ। বেঁচে আছে কিনা কে জানে। কেউ তাকে চিনে না। এক বৃষ্টির দিনে দৌড়াতে দৌড়াতে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল। তখন থেকে মনে হয়েছিল খুব আপন। দশ বছর তো দেখায় হয় নি।

কিন্তু তখন আমার শরীর খুব দুর্বল। ১৫ মিনিট একটানা হাঁটা অসম্ভব ছিল। তবু যাবো। কাক ডাকা ভোরে রওয়ানা দিলাম। দুপুরে পৌঁছলাম। আধমরা অবস্থা। রিয়াং দাদুর ঘর মাছাং ঘর। সাকো দিয়ে উঠতে হয়। সাকো উঠতে পারি নি। তিনি প্রথমে চিনতে পারেন নি। পরে চিনে কেঁদে ফেললেন।

তার নাম অমৃত রিয়াং। খুব রসিক মানুষ। সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। তিনি দূরের এক গ্রামে গিয়ে এক ধনী জুম চাষি রিয়াং তরুণীকে দেখে প্রথম দেখাতে প্রেমে পড়ে যান। সেই ব্রিটিশ আমলে তিনি কলিকাতা থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। তখন মেট্রিকুলেশন পাস করা মানে বিরাট কিছু।

তিনি জনসংখ্যা জরিপের জন্য করবুকের পশ্চিমে যান। গ্রামে পৌছতে বিকেল হয়। উঁচু পাহাড়। সেখানে সবাই জুম করত। জুমে অনেক আগে ধান তোলা শেষ। কিন্তু পুরানো জুমে কুমড়া গুলো পেকে সাদা হয়ে আছে। জুমের সবজি গুলো ফুল ধরে পেকে গেছে। কিছু বন্য ফুল ফুটে আছে। এলাকা নাম না জানা বুনোফুলের সুগন্ধিতে ভরে গেছে। এ সময় পরিবেশে এক ধরনের খুশির আমেজ ছড়িয়ে থাকে। পাহাড়ের মানুষ ছাড়া এই মনোরম পরিবেশ অনুভব করা সম্ভব নয়।

এ সময় পাহাড় উঠতে প্রচুর পানি পিপাসা হয়। পুরানো জুমের ছায়াহীন পথে ওপরে উঠতে তৃষ্ণার্ত ক্লান্ত অমৃত এক ঢোক পানি পেতে মরিয়া। তখন সীতা রিয়াংকে দেখে তিনি নির্বাক হয়ে যান। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। যতক্ষণ না সীতা দুষ্টামি করে তার বহন করা মাটির কলসি থেকে পানি হাতে নিয়ে অমৃতের গায়ে ছিটিয়ে দেন, ততক্ষণ তিনি নির্বাক ছিলেন।

ঠাণ্ডা পানির ফোঁটা আর সীতার কলকল হাসিতে অমৃত সম্বিত ফিরে পান। সেই হাসি তার জীবনের মোড় বদলে দেয়।

সীতার প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু সীতা তাকে গ্রহণ করেনি। স্বপ্ন ভেঙে যায়। তিনি মনে করেন সীতাকে ছাড়া তার বেঁচে থাকা অর্থহীন। তবু আত্মহত্যা করেন নি।

তিনি ত্রিপুরা ছেড়ে কলকাতা গেলেন। পুরনো বন্ধুদের সাথে সময় কাটালেন। কিন্তু বুঝলেন, তাঁর জীবন অর্থহীন। তার সীতাকে চায়। স্বপ্নেও সীতা, ভাবনায়ও সীতা। ডায়েরি সীতাকে লেখা চিঠিতে ভরে গেছে। অথচ কোন চিঠি তিনি পাঠাতে পারেন নি।

ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চরমে। ভাবলেন সীতার জন্য জীবন না দিয়ে দেশের স্বাধীনতায় জীবন দিবেন। তাই যোগ দিলেন সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে। কলকাতা থেকে ত্রিপুরা না এসে সরাসরি ইম্ফল হয়ে বার্মা সীমান্তে গেলেন।

ইম্ফল, কোহিমাসহ অনেক জায়গায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। রাতে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙত, কিন্তু মনে পড়ত সীতার হাসি। তিনি বুঝেছিলেন, প্রেম মানুষকে দুর্বল করে না, শক্ত করে।

একদিন দোকানে চাল কিনতে গেলে ধরা পড়ে যান। সাথে অস্ত্র ছিল না। বিনা অস্ত্রে মারামারি করলেন। কিন্তু এত জনের সাথে কি পারা যায়? তাকে কলকাতার জেলে নেওয়া হয়। জেলে কাটে তার জীবন।

স্বাধীনতার পরে তিনি মুক্তি পান। জেলের গেটে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে কেউ আসবে তিনি ভাবতে পারেন নি। কিন্তু গেটের বাইরে এসে তিনি অবাক। লম্বা লাইনের প্রথমে ফুল হাতে যে যুবতী দাঁড়ানো—তিনি সীতা। মুখে হাসি, চোখে অশ্রু। তাকে দেখা মাত্র ফুল মাটিতে ফেলে দিয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে তাকে ধরল।

ফিরে এলেন সীতাদের বাড়িতে। বিয়ে হল। সীতা অনেক আগে মারা গেছেন। সংসারে চার ছেলে আর এক মেয়ে। অনেক নাতিপুতি তার। সবাই আছে কিন্তু সীতা নেই। তিনি আর বিয়ে করেন নি। সীতার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন।

প্রথম দেখা সেই আম গাছের নিচে গল্প শেষ। এক সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরলাম। আমি এই এক সপ্তাহে অনেক সুস্থ। আমার হাঁটা বদলে গিয়েছিল। চোখে নতুন আগুন ছিল। আমি বুঝলাম, ব্যর্থতা মানুষকে মারে না, আত্মসমর্পণ মারে।

আমি মরে গেলে এটা লেখা হত না। বেঁচে আছি বলেই সম্ভব হয়েছে। বেঁচে থাকার অর্থ অতুলনীয়।

তাই, ব্যর্থতা যে কারণে হোক না কেন বাঁচুন। মেয়ের জন্য হলে বিপ্লবে যোগ দিন। কিন্তু বুঝবেন—বিপ্লব শুধু প্রেমের জন্য নয়, নিজের মর্যাদার জন্য। দেখবেন মেয়ের চেয়েও বিপ্লব বড়।

কে জানে হয়তো আপনি বিপ্লবে আপনার সীতাকে পেতে পারেন।

কারণ বিপ্লবে আপনার সৌন্দর্য প্রকাশ পাবে।

আর পাহাড়ের যুবক, মনে রাখবেন—আপনি পরাজিত নন। আপনি শুধু এখনো দাঁড়ান নি। দাঁড়ান। দেখবেন আপনার ভিতরের মানুষটাই সবচেয়ে সুন্দর।

সাংবাদিক সালিম সামাদ নিয়ে কিছু কথা

(সালিম শামাদের ছবি ফেইসবুক থেকে নেওয়া)
(সালিম শামাদের ছবি ফেইসবুক থেকে নেওয়া)

সাংবাদিক সালিম সামাদ নিয়ে লেখার আমার কোনো যোগ্যতা নেই। তাই তাকে বিশ্লেষণ করার দুঃসাহস আমি দেখাবো না। বরং তাকে ঘিরে পাহাড়ে যে অস্বস্তি, যে অস্বীকার, যে অদৃশ্য পরাজয়—সেটলার বাঙালী ও সামরিক মানসিকতার যে নীরব স্বীকারোক্তি—তা নিয়েই কিছু বলবো।

আমার লেখায় আবার কারো কারো প্রচণ্ড এলার্জি হয়। লেখা পড়া তো দূরের কথা, আমার লেখা নাম শুনলেও তাদের চুলকানি শুরু হয়। নাক-কান লাল হয়ে যায়। অবশ্যই সেই তালিকায় সেটলার আর মৌলবাদীরা প্রথম সারিতে। কারণ সত্য কখনো আরামদায়ক নয়। সত্য চামড়ায় লাগে, স্নায়ুতে লাগে, ইতিহাসে লাগে।

সেটলার কারা সেটা আমরা জানি। তারাও জানে। কিন্তু আমার লেখা পড়ার পর তাদের প্রথম কমেন্ট হয়, “পাহাড় কারোর বাপের নয়।” এই বাক্যটি আসলে যুক্তির ভাষা নয়, অস্বস্তির ভাষা। যখন ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানোর সাহস থাকে না, তখন স্লোগান ছুড়ে দেওয়া হয়। চুলকানি বাড়লে মানুষ যেমন অস্থির হয়ে ওঠে, তেমনি ইতিহাসের প্রশ্ন উঠলে তারা অস্থির হয়ে ওঠে।

তাদের এই প্রতিক্রিয়া দেখে আমারও একধরনের এলার্জি হয়। তবে সেটা রাগের নয়, বিদ্রূপের। আমি হাসি। কারণ যে বাক্যটি তারা বলে, সেটিই তাদের ভেতরের ভয়কে প্রকাশ করে। যে ভূখণ্ড নিয়ে এত জোরে বলা লাগে “কারোর বাপের নয়”, সেখানে নিশ্চয়ই ইতিহাস আছে আর সেই ইতিহাসের মালিকানা নিয়েই তো সংকট।

তাই বলি, সাংবাদিক সালিম সামাদ সম্পর্কে পড়ুন। কেন তিনি পাহাড়ে সম্মানিত ছিলেন তা জানুন। পাহাড় কখনো বাঙালী-বিরোধী ছিল না। পাহাড়ি আদিবাসীরা কখনো জাতিগত ঘৃণার রাজনীতি করেনি। ইতিহাস সাক্ষী—সমতল থেকে বাঙালী মানুষ ডেকে এনে প্রশাসন, রাজকার্য, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই কাজ দিয়েছে পাহাড়ের রাজারা। সহাবস্থান ছিল বাস্তবতা।

কিন্তু পাহাড়িরা কেন সেটলারদের বিরোধী?

ওই যে সেটলারদের সেই উচ্চারণ, “পাহাড় কারোর বাপের নয়।”

কে বলে পাহাড় কারোর বাপের নয়?

পাহাড় পাহাড়ি আদিবাসীদের বাপদাদাদের। মানুষ স্বীকার করুক আর না-ই করুক, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। দলিল আছে, প্রথা আছে, মৌখিক ঐতিহ্য আছে, ব্রিটিশ নথি আছে, ভূমি ব্যবস্থার প্রমাণ আছে। মালিকানার প্রশ্ন আবেগের নয়—ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার।

সালিম সামাদও এই কথাটাই বলেছিলেন। পাহাড়ে এমনি এমনি শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অস্ত্র ধরেনি। অস্তিত্বের সংকটে, অধিকার হরণের বাস্তবতায়, ভূমি হারানোর যন্ত্রণায় তারা সেই পথে গেছে। তিনি তার দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে এই প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। তিনি সংঘাতকে রোমান্টিক করেননি। কিন্তু কারণকে অস্বীকারও করেননি। এটাই তার শক্তি।

আজ দেখি, সেটলারদের ভেতরেও অনেক সাংবাদিক নামধারী লোক আছে। কিন্তু তারা সত্যের অনুসন্ধান করে না; তারা অবস্থানের সাফাই লেখে। তারা বলে আদিবাসীরা নাকি মিয়ানমার বা থাইল্যান্ড থেকে এসেছে। অথচ নিজেদের বংশপরিচয়ের ইতিহাস—নদীভাঙা বাস্তুচ্যুতি, রাজনৈতিক প্রকল্প, প্রশাসনিক পুনর্বাসন—এসব নিয়ে নীরব থাকে। সরকার কীভাবে পাহাড়ে জনসংখ্যা স্থানান্তর করেছে, কীভাবে ভূমির ভারসাম্য বদলেছে—সে আলোচনায় তাদের আগ্রহ নেই।

হ্যাঁ, একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে আমি বুঝি বর্তমান সেটলার নাতি-পুতিদের ব্যক্তিগত দোষ নেই। রাষ্ট্র এনেছে, নীতি এনেছে, প্রকল্প এনেছে। কিন্তু ইতিহাসের সত্য স্বীকার না করলে কোনো সমাধান হয় না। বরং স্বীকারোক্তিই হতে পারত সহাবস্থানের প্রথম ধাপ। সত্য মানলে সম্প্রীতির পথ খোঁজা যেত।

কিন্তু যখন স্থানীয় আদিবাসীদেরই “বিদেশি” বলা হয়, তখন প্রশ্ন ঘুরে দাঁড়ায়। তখন সেটলার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কেউ কেউ ভাসানচরের কথা বলে—এটা আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়। আমি বলি বাস্তবতা।

হ্যাঁ, বাস্তব সমাধান আবেগ দিয়ে হয় না তাও পাহাড় বুঝে। তবে এটাও সত্য—পরিস্থিতি চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস স্থির থাকে না। তাই ভবিষ্যতের আগে বর্তমানকে স্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ।

সেটলারদের স্বীকার করতে হবে যে তারা স্থানীয় নয়। আবার এটাও স্বীকার করতে হবে—মানবিক সমাধান ছাড়া কোনো পথ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সত্যের উপর দাঁড়িয়ে সমাধান চাই, নাকি অস্বীকারের উপর দাঁড়িয়ে সংঘাত টিকিয়ে রাখতে চাই?

তাই সালিম সামাদ থেকে শিখুন। তিনি ঘৃণার পক্ষ নেননি। তিনি পক্ষ নিয়েছিলেন প্রেক্ষাপটের। তিনি শিখিয়েছেন, অস্ত্রের পেছনে ইতিহাস থাকে, আর ইতিহাসের পেছনে থাকে অধিকার। যে সমাজ এই স্তরগুলো বুঝতে শেখে, সে সমাজই একদিন সংঘাতের বদলে ন্যায়বিচারের ভাষায় কথা বলতে পারে।

সেটলাররা বুঝবে কি?

ভাগাভাগির ক্ষমতা নাকি কামড়া-কামড়ির অপেক্ষা?

নির্বাচন হলো। সব শান্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছে সব কিছু ঠিকঠাক। কিন্তু এই ‘ঠিকঠাক’ গল্পের চাপায় পড়ে কত না বলা কাহিনী যে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে, তা আমরা জানি না।

সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও কোথাও যেন একটা অস্বস্তি রয়ে গেছে। বাজ পড়ার আগে যেমন অস্বাভাবিক নীরবতা নামে, তেমন এক নিস্তব্ধতা চারপাশে।

সেনা এখনো মাঠে আছে। কথা অনুযায়ী তারা ব্যারাকে ফিরবে। মানুষ রাস্তায় নামবে। বাড়ির মানুষ আবার পেটের খিদে বুঝতে শুরু করবে।

তারপর ধীরে ধীরে চাপা পড়া কাহিনীগুলো বেরিয়ে আসবে। সেনা ও সরকারের পরিকল্পনাও প্রকাশ পেতে শুরু করবে। শোনা যাচ্ছে দুই দলকে নিয়ে গোপনে গোপনে একটি ঐকমত্যের সরকার গড়ার চিন্তা চলছে। তার মানে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে ভাগাভাগি করে ক্ষমতা, ভাগাভাগি করে সম্পদ—এমন হিসাব কি সত্যিই টেকসই?

কিন্তু পেছনের গল্পটা তারা হয়তো জানে না। ঠিক রাখতে পারলে ভালো। কিন্তু রাখতে না পারলে বিপদ গভীর হবে। যারা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ভেতরের স্রোত দেখেছে, তারা জানে এই ধরনের সমঝোতা ভেঙে গেলে তার ফল শুধু রাজনৈতিক থাকে না, তা হয়ে ওঠে অস্থিরতার সূত্র।

বিষয়টি পরিষ্কার করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের একটি সহজ উদাহরণ দিই।

একই গৃহের দুই কুকুর যখন গুই ধরে, একটি ঘাড়ে আর অন্যটি লেজে কামড় মারে। পরে মালিক এসে তাদের সাহায্য করে। শিকার নিয়ে তাদের মধ্যে বড় ঝগড়া হয় না। তারা আবার একসাথে এক বাটিতে ভাতও খায়।

কিন্তু সবসময় তা হয় না। অনেক সময় একই গৃহের দুই কুকুরও এক বাটিতে ভাত খেতে পারে না। পেটে খিদে যখন বেশী থাকে তখন কামড়া-কামড়ি শুরু হয়।

বাংলাদেশের শাসনের চিত্রও সেই রকম হতে পারে। কারণ এই শক্তিগুলো কখনো প্রকৃত অর্থে ভাগাভাগি করতে শেখেনি। কে কার বস, কে কার চেয়ে বেশি পাবে—এই প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত দ্বন্দ্ব ডেকে আনে।

ইউনুস সরকারের দুর্নীতির ইতিহাসও একসময় সামনে আসবে। এখন অনেকের কাছে ইউনুস সাহেবকে বেশ নিষ্পাপ মনে হচ্ছে।

কিন্তু ক্ষমতার ভেতরের কামড়া-কামড়ি শুরু হলে সেই চিত্রও বদলে যেতে পারে। দেশ না ছাড়লে তার অবস্থাও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

যাক, দেখার অপেক্ষা।