পাহাড়ে ভীমরাজ নীতি বিলুপ্তি চাই

ভীমরাজ না চিনলেও ছবিটা দেখলেই চিনে ফেলবেন। পাহাড়ের আদিবাসীরা একে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন নামে ডাকে। বাংলায় পরিচিত নামগুলোর মধ্যে “ভীমরাজ” একটি।

এই জানেবাজ পাখিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা—সবাই পাখির রাজা বলে জানে। কিন্তু এই রাজত্বের বৈশিষ্ট্য কী? অন্য পাখির কাছ থেকে খাবার কেড়ে খাওয়া। নিজেরা শিকার করে বাঁচে না, চুরি করে বাঁচে। অলসতা এদের স্বভাব।

এই স্বভাবটাই পাহাড়ে বহু আদিবাসী নেতার চরিত্র হয়ে উঠেছে। তারা মনে করে—রাজা মানে সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো খাবার কেড়ে খেয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা।

কিন্তু সত্যিকারের পাখির রাজা কে?

ইগল।

নিজের খাবার নিজেই খুঁজে আনে। কারও খাবার কেড়ে বাঁচে না। শক্তি, সাহস আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক।

তাহলে ভীমরাজ কে?

রাজা নয়—গুণ্ডা পাখি।

আর পাহাড়ে যারা নিজেদের ভীমরাজ ভেবে রাজা সেজে আছে, যারা সাধারণ মানুষের খাবার কেড়ে খেয়ে বেঁচে থাকে—তারা নেতা নয়। তারা গুণ্ডা।

অথচ চড়ুই কত ছোট। তবু কী সুন্দর তার স্বভাব। ঐক্য আছে, সহমর্মিতা আছে। একসঙ্গে থাকে। কারও খাবার না থাকলে ভাগ করে খায়।

এবার মূল কথায় আসি।

একজন সাধারণ মানুষ যখন ১০০ টাকার বিনিময়ে দাঁড়ি-পাল্লার নির্বাচনী প্রচারণায় যায়, শুধু এই আশায় যে সন্ধ্যায় তার পরিবার দুমুঠো নুনভাত খেতে পারবে—তখন সে হয়ে যায় ‘জাতিবিরোধী’।

আর যার গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, নিরাপদ জীবন আছে—সে যখন মাথা দুলিয়ে মিথ্যে আশ্বাস দেয়, ধানের শিষে ভোট চেয়ে জুম্ম জাতির অধিকারের নামে বিভ্রান্তি তৈরি করে—তখন তার সমালোচনা করার কেউ থাকে না। তখন সে হয়ে ওঠে ‘নেতা’।

যখন কেউ সেনানিবাসে বসবাস করে সেনাবাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও না বলে, বরং বিপক্ষের স্বজাতি ভাইয়ের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদগার করে—তখনও সে নেতা।

আর কেউ সরকারের দালানকোঠায় থেকেও সরকারের বিরুদ্ধে নীরব থাকে, অথচ নিজেকে বিপ্লবী নেতা বলে পরিচয় দেয়—তখন জনগণ যাবে কোথায়?

মানুষ তো দিশেহারা হবেই।

তখন যার যা ইচ্ছে তা করবে। নেতাদের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মাবে। কেউ হোটেলে দেহ বিক্রি করবে। কেউ চীনে গিয়ে নিজেকে বিক্রি করবে। কেউ সমুদ্র পাড়ে গিয়ে নিজেকে বাঙালির হাতে তুলে দেবে। উপায় তো আর থাকে না।

কখনো ভেবে দেখেছেন, কতটা অসহায় হলে একজন নারী নিজের সম্মান বিসর্জন দেয়? কতটা অসহায় হলে একজন নারী বিদেশির কাছে নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়?

এই অসহায়তা বোঝার ক্ষমতা আপনাদের নেই।

মানুষ জঙ্গলে আলু বিক্রি করলে আপনারা একভাগ পান। হাজারো মানুষের রক্তের টাকায় আপনারা ভালো থাকেন। সেই রক্তক্ষরণের ওপর দাঁড়িয়ে আপনাদের ছেলে-মেয়েরা বিদেশে পড়ে।

আর যারা রক্ত পানি করে আপনাদের এই টাকা জোগায়, তাদের সন্তানরা বছরে একটি পছন্দের পোশাকও কিনতে পারে না।

এই ভীমরাজ নীতির জন্য আপনাদের ধিক্কার।

পাহাড়ে যেসব দৃশ্য আজ হঠাৎ চোখে পড়ছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো বহুদিন ধরে জমে থাকা এক সামাজিক বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ।

বাইরে থেকে মনে হতে পারে মানুষ বদলে গেছে। কিন্তু ভেতর থেকে দেখলে বোঝা যায় পাহাড়ের নীতিই মানুষকে বদলাতে বাধ্য করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে একটি নীরব বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে—নিজের পরিচয়, নিজের মানুষ, নিজের সমাজ টিকে থাকার নিশ্চয়তা নয়। টিকে থাকতে হলে অন্য কিছু ধরতে হবে।

এই বার্তাটা প্রথম গ্রহণ করেছে যারা সুযোগের কাছাকাছি ছিল—শহরে থাকা, শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মানুষরা। তারাই দেখিয়েছে, সুবিধা পেতে গেলে অবস্থান বদলানো দোষের নয়।

ফলে গ্রাম, দুর্গম এলাকা আর চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষদের সামনে নৈতিকতার বিলাসিতা আর থাকে না। তারা দেখে—যারা আগে পথ দেখাত, তারাই এখন দরকষাকষির অংশ।

বিশ্বাস ভেঙে যায়। আর সেই শূন্যতায় ঢুকে পড়ে যে কোনো শক্তিশালী প্রভাব।

পাহাড়ে যে জনসমাগম দেখা যায়, তা অনেক সময় আদর্শের কারণে নয়—প্রয়োজনের কারণে। এটা বিশ্বাসের গল্প নয়, বেঁচে থাকার গল্প। এখানে মানুষ প্রশ্ন করে না, “এটা ঠিক না ভুল”—প্রশ্ন করে, “এতে আজকের দিনটা যাবে তো?”

সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্য হলো এই প্রক্রিয়ায় কাউকে একা দায়ী করা যায় না। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দায় ছড়িয়ে গেছে। নেতৃত্ব দিয়েছে সুবিধাভোগীরা, অনুসরণ করেছে অসহায়রা। মাঝখানে হারিয়ে গেছে সমাজ, হারিয়ে গেছে পরিচয়ের ভারসাম্য।

শেষ পর্যন্ত পাহাড় আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্য হচ্ছে যখন অর্থ আর সুযোগই একমাত্র নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষ আদর্শ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় না।

তখন বিক্রি হওয়াটা চরিত্রের ব্যর্থতা নয় বরং নীতি হয়ে ওঠে। দল, নেতারা যা বলে তার বিপরীতে যাবে। কারণ তারা আর ভীমরাজ পাখির কাছে খাবার হারাতে চায় না।

তাই ভীমরাজ হয়ে রাজা সাজার চেষ্টা নয় বরং চড়ুই হওয়ার চেষ্টা করুন।

নইলে পাহাড়ে আদিবাসী অস্তিত্ব থাকবে না। মানুষ আরো বেপরোয়া হবে।

পোস্ট ৭ঃ কোন সরকারই বেশি দিন টিকবে না কেন?

বাংলাদেশে আইন এখন ঘুমন্ত। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, কিন্তু তারা দায়িত্ব পালন করছে না। কারণ কেউ তাদের আর পাত্তাই দিচ্ছে না।

এটা কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়। থানায়, আদালতে, রাস্তায় সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এই বাস্তবতা দেখছে এবং ভোগ করছে।

এই সব কিছু মিলেই মানুষ বুঝে যায়, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি অরাজক দেশে পরিণত হয়েছে। যদিও দেশের মানুষ মনে মনে এই সত্য মেনে নেয়, তবু কথাটা মুখে স্বীকার করতে আত্মসম্মানে লাগে। ভয়, অভ্যাস আর “আর কীই বা করা যাবে”—এই মানসিকতাই মানুষকে নীরব করে রাখে।

এবার যে কথায় আসছিলাম, সেখানে ফিরে আসি।

অনেকেই বলছে, বাংলাদেশে নির্বাচন হলে দেশ আবার সুন্দর করে চলবে। কারণ বিরোধী দল তো নেই বললেই চলে। দেশে এখন কার্যত বিএনপি আর ইসলামি জামায়াতের জোট।

এরা বহু বছর ধরেই একসাথে ঘুমাচ্ছে, খাচ্ছে, বেড়াচ্ছে। একসাথে লীগ সরকার উৎখাত করেছে, লীগকে ধ্বংস করেছে। সুতরাং এবার একসাথেই দেশ চালাবে। তাদের মধ্যে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

তাই ভাগ-বাটোয়ারা করে দেশ চালাবে, অর্থাৎ খেয়ে ফেলবে—এই ধারণাটাই অনেকের।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতি এত সহজ নয়। ক্ষমতার ভাগাভাগি শুনতে সহজ হলেও, ক্ষমতার ভেতরের দ্বন্দ্ব কখনো এত শান্তভাবে মেটে না। বাংলাদেশের বাঙালীদের মধ্যে তা একেবারে অসম্ভব।

এই যুক্তিটা ভালোভাবে বোঝার জন্য একটু পিছনে যাওয়া দরকার।

নির্বাচন ঘোষণার আগে ইউনুস সর্বদলীয় জোট গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। বলা যায়, তিনি লাখবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেন নি।

সর্বদলীয় জোট হলে তিনিও তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। তিনি ব্যর্থ হন। সময় গড়িয়েছে, চাপ বেড়েছে, আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত চাপে পড়ে তিনি নির্বাচনের নাটক শুরু করেন।

এই নির্বাচনের নাটকের ভেতরে তার হিসাব ছিল আলাদা। তিনি ভেবেছিলেন, বিএনপি আর জামায়াত জোট মিলে দেশ চালাবে, আর তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে যাবেন। ক্ষমতার কেন্দ্র থাকবে, শুধু ভারসাম্য বদলাবে। সর্বদলীয় সরকার হলে যতটা সুবিধা রাখা যেত, নির্বাচিত জোট সরকারে সেটা কম হবে—এই বাস্তবতাও তিনি জানতেন।

বিষয়টি আরো একটু সহজ করে বলি। বিশ দিন অভুক্ত প্রাণী যখন রাজভাণ্ডারে খাবার দেখে, তখন সে লোক মনে করে সব খাবার সে একাই খেয়ে ফেলবে। সে ভুলে যায়, যত ক্ষুধাই লাগুক না কেন, মানুষের পেট রাজভাণ্ডার খালি করতে পারে না।

রাষ্ট্রও ঠিক তেমন। ক্ষমতা দেখলে অসীম মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তার সীমা আছে।

একইভাবে, প্রাণীর মধ্যেও পার্থক্য আছে। কেউ আস্তে আস্তে খায়। কেউ আবার কামড়া-কামড়ি করে খায়। ফলে যা হয় – খাওয়ার চেয়ে খাবার নষ্ট হয় বেশি। বিএনপি আর জামায়াত জোটের অবস্থাও অনেকটা সেরকম। দীর্ঘ দুই দশক ধরে তারা কার্যত না খেয়েই আছে।

তাই এখন তারা ভাগাভাগি করে খাবে এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। অন্তত আমার মনে হয় না। আর এই কামড়া-কামড়ির ভিড়েই সবচেয়ে আগে ছিঁড়ে যায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আর মানুষের আস্থা।

এই অবস্থাতেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা আরও অবনতি হবে। মারামারি বাড়বে। শাসন থাকবে, কিন্তু শাসন করার সক্ষমতা ও নৈতিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। ফলে অবধারিতভাবেই নতুন করে নির্বাচনের ডাক উঠবে। কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যেই সরকার ভেঙে পড়বে এবং আবার নতুন নির্বাচন হবে। পাঁচ বছর সরকার টিকতে পারবে না।

তাই এই বাস্তবতাকে এখন থেকেই চোখে রেখে চলতে পারলে পাহাড়ে আগাম বড় বিপদের কিছুটা অন্তত পথ রোধ করা যাবে। দালাল এক দিনে উধাও হবে না, তবে আজকের অবস্থান থেকে অন্তত একটু ভালো জায়গায় থাকা সম্ভব। এই সময় অন্ধ আনুগত্য বা ভুল পক্ষ বেছে নেওয়ার মাশুল ভবিষ্যতে পাহাড়কে অনেক বড় করে দিতে পারে—এই বোধটুকু মনে রাখা দরকার।

সবচেয়ে বড় কথা, সর্বদলীয় সরকার হোক বা নির্বাচিত সরকার—এই সরকারের মেয়াদ হবে খুবই অল্প।

পোস্ট ৬: খাগড়াছড়িতে মারমা এমপি চাই

খাগড়াছড়ি জেলায় চাকমা, ত্রিপুরা, এমনকি বাঙালী সম্প্রদায় থেকেও এমপি হয়েছে। কিন্তু একটি জনগোষ্ঠী আজও বঞ্চিত মারমারা। একজনও মারমা এমপি খাগড়াছড়ি কখনো পায়নি। এটা কাকতাল নয়, এটা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামোর ফল।

মারমারা অযোগ্য নয়। বরং তারা শান্তিপ্রিয়, বিশ্বাসযোগ্য এবং কথা দিলে কথা রাখে এমন মানুষ। সামাজিকভাবে তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব নেই। কিন্তু রাজনীতির মাঠে এসে সেই ঐক্য বারবার ভেঙে পড়ে—বিশেষ করে বিএনপির ভেতরের বিভাজনের কারণে। এটি কিন্তু অনেকে স্থানীয় নেতাদের একটি কূটচাল বলে অনেকে মনে করে।

বর্তমানে মারমা সমাজের মধ্যে বিএনপি সমর্থনে দুটি গ্রুপ দেখা যায়। এটা আসলে মারমাদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তারই প্রকাশ। অথচ তারা ঐক্যবদ্ধ হলে এমপি প্রার্থী দাঁড় করানোর মতো শক্তি ও জনসমর্থন—দুটোই রয়েছে।

তবু বাস্তবতা হলো, বিএনপির ভেতরে মারমাদের এমপি হওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ। ওয়াদুদ বহুবার নির্বাচনে ব্যর্থ হলেও তিনি কাউকে সুযোগ দিতে রাজি নন। এই একচেটিয়া রাজনীতির ফলেই সমীরণ দেওয়ান বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন এবং তার জয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, মারমাদের একটি বড় অংশ এখনো ওয়াদুদের পেছনে পড়ে আছে। এই নির্বাচনে ওয়াদুদ হারলেও ভবিষ্যতে মারমা প্রার্থীর সুযোগ তৈরি হবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ওয়াদুদ নিজে না দাঁড়ালেও তার স্ত্রীকে প্রার্থী করার সম্ভাবনাই বেশি।

আমার পর্যবেক্ষণ হলো এই নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক না কেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বড়জোর কয়েক মাস থেকে দেড় বছর। রাজনৈতিক সংকট, আঞ্চলিক চাপ এবং প্রতিবেশী ভারতের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে এই সরকার শুরুতেই চাপে পড়বে। ফলে এই নির্বাচন শেষ হওয়ার আগেই তার বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

এই বাস্তবতায় মারমাদের সামনে প্রশ্নটা আরও জরুরি, তারা কি খাগড়াছড়ির বিএনপিকে একটি পারিবারিক রাজনীতির গণ্ডি থেকে বের করে আনতে পারবেন? এজন্য বিএনপি ছাড়তে হবে না, কিন্তু স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।

শেষ প্রশ্নটা থেকেই যায়, মারমা বুদ্ধিজীবীরা কি সেই সাহস নিতে পারবেন?

পোস্ট ৫ঃ পাহাড় RAW আর ISI খেলা

শিরোনাম দেখে ঠোঁটের ফাঁকে বিদ্রূপের হাসি তুলে আমাকে বিদ্রূপ করতে পারেন। অবিশ্বাস করতে পারেন। কিন্তু তাতে সত্য বদলাবে না।

পাহাড়ে যা হচ্ছে হাসিনা পতনের পর সমতলেও হচ্ছে। পার্থক্য শুধু অস্তিত্ব আর ক্ষমতা। পাহাড়ে অস্তিত্বের প্রশ্ন আর সমতলে মানুষ বলে ক্ষমতার লড়াই।

ভারতের চাপে পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তি হয়েছে তা কমবেশি সত্য। কিন্তু চুক্তিকে বাতিল করে ভারতের চালকে রুখে দেওয়া ছিল পাকিস্তানের চাল। অবশ্যই অনেকে সেটা ভুল করে বিএনপি’র ওপর চাপিয়ে দেয়। বিএনপি মাত্র উপাদান। বিএনপি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র।

এখনো অনেকের বুঝার বাইরে আছে। অনেকে শুধু দেখে বিশ্বাস করে। আবার অনেকে শুনে বিশ্বাস করে। অনেকে আবার সব থিওরি মিলিয়ে বিশ্বাস করে।

হয়তো প্রমাণ চাইবেন। তাও আমি জানি। হাজারো প্রমাণ আছে। কিন্তু পরিস্থিতি এবং পরিবেশ দেখে না বুঝলে হাজারো প্রমাণও অকেজো।

পাহাড়ে বর্তমানে অনেক আঞ্চলিক দল। এগুলো এই দুয়ের উপসর্গ মাত্র।দলের মুল কতিপয় নেতা ছাড়া বাকিরা জানার কথা নয়।

তাহলে তারা জেনে এটা করছেন কেন?

প্রশ্ন তো সেটাই। ক্ষমতার লড়াই।

তবে এইটুকু বলবো যে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। ভারত এবং বাংলাদেশে নেতাদের মধ্যে হয়তো অনেকে হারিয়ে যেতে পারে। ভাগ্য ভাল হলে গ্রেপ্তার হবে। আর খারাপ হলে হারিয়ে যাবে।

তখন বুঝতে দেরি হবে না যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে। দেড় বছর আগে হতে আমরা শুনে আসছি ভারত-বাংলাদেশ যুদ্ধ অনিবার্য। হ্যাঁ, অনিবার্য। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়তো একেবারে অসম্ভব।

এটা লিখছি একারণে যে নির্বাচন নিয়ে অনেক হুমকি দুমকি চলছে। আসলে পাহাড়ে নির্বাচন ভোটে ঠিক হবে না। প্রার্থী ঠিক করবে অন্য কেউ। তাই নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে যেন সব সাধারণ মানুষ যেন একটু সংযত থাকে সেই অনুরোধ করি।

আমি জানি আমি কেউ নই। আমি সাধারণ মানুষ। সংযত সতর্কতা দলগুলির করা দরকার। কিন্তু তারা করবেন না। কারণ সেটার মূল্য কেউ দিবে না।

অবশ্যই সাধারণ মানুষের অনেকে বিষয়টি জানে। কিন্তু ভয়ে বলতে পারছে না।

আমি সাধারণ মানুষ বলে সাধারণ মানুষের কষ্টকে বুঝি। তাই পাহাড়ের প্রতিটি জীবন বাঁচুক সেই কামনা করি।

হ্যাঁ, এবারে হয়তো অনেকে ভাবছি বিএনপি সরকার গঠন করবে। কিন্তু যদি জামাত আসে তাহলে কি হতাশ হবেন? হতেও তো পারে। যে জামাত লীগের মত একটি শক্তিশালী সরকারকে কয়েকদিনে পতন ঘটাতে পারে সেই জামাত নির্বাচনে জয়লাভ করা তো অসম্ভব কিছু নয়।

সেই একি সূত্রে যদি রাঙ্গামাটি বাদে বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে জামাত জোট ক্ষমতায় আসে তাও অসম্ভব নয়।

ভাল থাকবেন। সুখী থাকবেন। মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন। নির্বাচন আমাদের কিছু বদলে দিবে না। বদলাতে হলে আমাদের চিন্তাশক্তি বদলাতে হবে। ঠিক করতে হবে আমরা কোন পথে হাঁটবো।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মাঝে বিভাজন দূর করতে হবে। শুধু দল বা নেতা দেখে রাজনীতি করলে হবে না। জুম্মজাতীয় অস্তিত্ব দেখে ভাবতে হবে।

পোস্ট ৪ঃ খাগড়াছড়িতে ভোট নয়, দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই

খাগড়াছড়ির নির্বাচনী মাঠে এবার লড়াইটা পোস্টার আর মাইকের নয়। এটি আসলে দুই ধরনের রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়ানো।

এক রাজনীতি বিশ্বাস করে, রাজনীতি মানে দৃশ্যমান হওয়া। বড় সভা, উচ্চস্বরে ঘোষণা, ব্যানার আর শ্লোগানে শক্তির জানান দেওয়া। মাঠে নামলেই যেন বোঝাতে হবে—কে কত বড়, কে কত শক্তিশালী।

হ্যাঁ, ওয়াদুদ ভুঁইয়ার প্রচারণা এই ধারারই প্রতিনিধি। সংগঠন, উপস্থিতি আর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি নির্বাচনী মাঠে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন।

অন্য রাজনীতিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটে। এখানে রাজনীতি মানে কাছে যাওয়া। কথা বলা নয়, কথা শোনা। কোনো ঘোষণা নেই, কোনো প্রদর্শন নেই।

এটি সমিরণ দেওয়ানের প্রচারণার সেই নীরব ধারা। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষকে দেখান না। বরং তিনি মানুষের পাশে বসে তাদের কথা বোঝার চেষ্টা করেন। প্রচারণা এখানে অনুষ্ঠান নয়, সম্পর্ক।

এই দুই পথের পার্থক্য এখন আর গোপন নেই। একদিকে রয়েছে “আমাকে দেখো” ধরনের রাজনীতি।

আর অন্যদিকে “তোমার কথা শুনি” ধরনের রাজনীতি। একটিতে শক্তি আগে, মানুষ পরে। অন্যটিতে মানুষ আগে, শক্তি পরে।

খাগড়াছড়ির মানুষ এই বৈপরীত্য খুব ভালোভাবেই বুঝছেন। তারা দেখছেন, কে সমর্থন চাইছে, আর কে বিশ্বাস তৈরি করছে। কে বক্তৃতা দিচ্ছে, আর কে প্রশ্ন নিচ্ছে। কে আজকের জন্য ভোট চাইছে, আর কে আগামী দিনের সহাবস্থানের কথা বলছে।

এই নির্বাচন তাই শুধু দুই প্রার্থীর প্রতিযোগিতা নয়। এটি আসলে সিদ্ধান্ত, আমরা কোন ধরনের রাজনীতি চাই। দৃশ্যমান শক্তির রাজনীতি, নাকি নীরব কিন্তু গভীর আস্থার রাজনীতি।

খাগড়াছড়ির ভোটাররা এবার শুধু ভোট দিচ্ছেন না। তারা একটি পথ বেছে নিচ্ছেন। কোন পথ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সময় যত এগোবে ততই বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে।

পোস্ট ৩ঃ হঠাৎ ‘ওয়াদুদ হঠাও’ ডাক উঠলো কেন—খাগড়াছড়ির মানুষ কী ভাবছে?

খাগড়াছড়িতে হঠাৎ করে “ওয়াদুদ হঠাও” শ্লোগান উঠেছে। আসলে এটা কোনো হঠাৎ আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়।

এটা দীর্ঘদিন জমে থাকা প্রশ্ন আর হতাশার প্রকাশ। মানুষ এখন আর শুধু দল দেখে ভোট দিতে চায় না। তারা প্রার্থীর রেকর্ড আর ভূমিকা দেখতে চায়।

ওয়াদুদ ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে আছেন। কিন্তু তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মামলার ইতিহাস, দুর্নীতির অভিযোগ—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের মন থেকে কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।

আদালতে খালাস পাওয়া এক বিষয়। কিন্তু রাজনীতিতে মানুষের বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা আরেক বিষয়।

এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে আরেকটি গুরুতর অভিযোগও ঘুরে ফিরে আসছে। পাহাড়ি জমি দখল করে তাঁর নামে ‘ওয়াদুদ পল্লী’ বানানো হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ সত্য কি না সেটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষের জমির ওপর গ্রামের নাম একজন রাজনীতিকের নামে কেন হবে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব আজও মানুষ পায়নি।

আরেকটি প্রশ্ন আরও গভীর। যদি একজন মানুষ বারবার পদ আঁকড়ে ধরে থাকেন, তাহলে নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসবে কীভাবে?

গত প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে একই নাম ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে খাগড়াছড়ির সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে—এই প্রশ্নও উঠছে।

এই প্রশ্নগুলো সবচেয়ে বেশি তুলছে তরুণরা। যারা প্রথম বা দ্বিতীয়বার ভোট দিতে যাচ্ছে, তারা চায় নতুন নেতৃত্ব, কম বিতর্ক, কম অহংকার। তাদের চোখে রাজনীতি মানে আর উত্তরাধিকার নয়, জবাবদিহি।

এই পরিস্থিতিতেই এবার ভিন্ন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার মারমা জনগোষ্ঠীর একজন পাহাড়ি–বাঙালি সমন্বয়পন্থী নেতা ছিলেন, যিনি সুযোগ পেলে বিএনপিকে সহজেই জয়ের পথে নিতে পারতেন—এমন বিশ্বাস অনেকের ছিল।

কিন্তু দলীয় কাঠামোয় সেই সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে সমীরণ দেওয়ান বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি এখন কয়েকভাগে বিভক্ত। যদি মারমা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সমীরণের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার পরাজয় নিশ্চিত—এমন বিশ্লেষণও শোনা যাচ্ছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানেই দলবিরোধিতা নয়। অনেক সময় এটি দলকে শোধরানোর একটি রাজনৈতিক বার্তা। নির্বাচনের ইতিহাসে এমন হাজারো নজির আছে।

আজ খাগড়াছড়ির মানুষ ভয় দেখাতে চায় না, তারা ভোটের মাধ্যমে কথা বলতে চায়। তারা বলতে চায়—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একই মানুষ বারবার সুযোগ নিলে যোগ্য নেতৃত্ব বারবার বঞ্চিত হয়।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি না আসে, তাহলে “ওয়াদুদ হঠাও” শুধু শ্লোগান থাকবে না—এটা রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।

পোস্ট ২: সমীরণ বনাম ধর্ম-এর অদেখা রহস্য আসলে কি?

আজ জানুয়ারী ২৪।। সব টিকটাক থাকলে ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারী। কিন্তু অনেকের মত এখনো ভোটের পরিবেশ নেই। ভোট হবে কিনা বিজ্ঞ মহলে এখনো সন্দেহ রয়ে গেছে।

এই লেখাটি কোনো ব্যক্তিকে জেতানো বা হারানোর প্রচারণা নয়। এটি পাহাড়ের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা এক অদৃশ্য দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও নেতৃত্ব সংকট নিয়ে কথা বলার চেষ্টা। যারা ভাবছেন এটা শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক লেখা, তারা আসলে সমস্যার গভীরে তাকাচ্ছেন না।

হ্যাঁ, পাহাড়ও থেমে নেই। রাঙ্গামাটিতে বিজয়ী প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেলেও বান্দরবানে জেরি বাবু একটু এদিক ওদিক হলে হেরে যেতে পারেন। NCP-র বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

কিন্তু খাগড়াছড়ি অবস্থা চরমে। আদিবাসীদের মধ্যে ভোট কে জিতবে তা নিয়ে এই চরম উদ্বেগ নয়। বরং এখানে সমীরণ বনাম ধর্মজ্যোতি। সোজা করে বললে বলতে হ, PCJSS বনাম UPDF।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০১ সালের কথা মনে আছে কি?

অক্টোবর ১, ২০০১ সালে এটি অনুষ্ঠিত হয়। UPDF নির্বাচনে যোগ দেয়। PCJSS নির্বাচন না করলেও উপেন্দ্রলালকে সমর্থন দেয়। ভোট যুদ্ধ তুমুল হয়।

অনেকের মতে, আসলে এটা শুধু ভোট যুদ্ধ ছিল না। কারণ এ ভোট যুদ্ধের সাথে সাথে অস্ত্রযুদ্ধ প্রকট হয়ে উঠে।

সেই সময় রাষ্ট্র বা প্রশাসন কার্যকর কোনো মধ্যস্থতা না করে বরং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে ধীরে ধীরে সহিংস সংঘাতে রূপ দেয় এবং দুই বলদের লড়ায়ের মত আনন্দ উপভোগ করে। অথচ পাহাড় এই বিভেদে ভাইয়ের বুকের তাজা রক্তের মূল্য আজও পাহাড় বহন করছে।

এই অস্ত্র যুদ্ধ প্রায় তিন দশকে পা দিয়েছে।

পাহাড় আজ সেই ২০০১ সালের পুনরাবৃত্তি দেখছে। তাই এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও আসলে নির্বাচনে কে জিতবে বা কে হারবে সেটা নয়। এটা হচ্ছে কে থাকবে আর কে থাকবে না সেই উপসর্গ।

বুঝতে পেরেছেন কি বলছি নিশ্চয়।

এবার একটু সহজ করে বলি।

ধরুন, একি গ্রামে দুজন ছোট বালক একে ওপরের কাছে হার মেনে নিতে চায় না। সব সময় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে।

তখন গ্রামের মুরুব্বিরা কি করে তাদের সেই বিরোধ মীমাংসা করে?

আমি সেই সেরকম অনেক ঘটনা দেখেছি। পাহাড়ি গ্রামে এটা সমাধান করার বংশ পরস্পরায় প্রচলিত একটি সহজ উপায় আছে। তা হচ্ছে সকলের সামনে দুজনকে “বোদাবুদি”র মাধ্যমে হার জিত নির্ণয় করা। বারবার যে তিন বার জিতে সেই জয়ী। আর যে হারে তার সে হার মেনে নেয়।

হার-জিত নির্ণয়ে এটি পাহাড়ে আদিবাসীদের যুগযুগ ধরে প্রচলিত প্রথা।

কিন্তু বাস্তবে আজ পাহাড়ের রাজনীতি আর গ্রামের উঠোনে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে অস্ত্র, সীমান্ত, রাষ্ট্রীয় কৌশল এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা জড়িয়ে গেছে। তাই রায় যত দেরিতে আসবে, ক্ষতিও তত গভীর হবে।

আজ সেই দুই বালক যদি একজন PCJSS আর আরেকজন UPDF হয় আমরা কি সেই একি নিয়ম মেনে হার জিত নির্ণয় করতে পারি না ?

উন্নয়ন বাদ দিন। পাহাড়ে কি উন্নতি হয়ে তা বাদ দিন। আগে বিবাদ মীমাংসা করি। সেই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে আজ ২৬ সালের জানুয়ারী ২৪ তারিখ হিসেব করে দেখি কে জিতেছে?

সংক্ষেপে দেখি-

১) PCJSS- এর আঞ্চলিক পরিষদ আছে (দেশে)

UPDF-এর সে রকম কিছু নেই

২) PCJSS আন্তর্জাতিকভাবে পাহাড়ের কথা UN পর্যন্ত প্রতিনিধি পাঠায়

UPDF আজ পর্যন্ত কাউকে পাঠাতে পারে নি

৩) PCJSS অন্তত একবার MP নির্বাচনে জয় লাভ করেছে

UPDF বারবারই ফেল করেছে

৪) PCJSS দুভাবে বিভক্ত হয়েছে কিন্তু কোন ভাগ UPDF এ যোগ দেয় নি

UPDF দুভাবে বিভক্ত হয়েছে কিন্তু একভাবে PCJSS যোগ দিয়েছে

৫) আগের অনেক অঞ্চল এখন PCJSS-এর দখলে

৬) ভারতের নির্ভরতা PCJSS- এর ওপর বেশী (এই পয়েন্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা এখনো হয়তো খুলে বলা যাচ্ছে না)।

এবার তাহলে জনগণ সিদ্ধান্ত দিক এখানে জয়ী কে?

UPDF হার মেনে নিতে পারবে না। কারণ তাদের মধ্যে সেই দুরদুরশিতা নেই। থাকলে তারা এতদূর এগুত না। অনেকদিন আগে হাত মিলিয়ে বসে যেত। আমি বলছি না PCJSS সব ক্ষেত্রে সঠিক।

কিন্তু সাধারণ জনগণের দৃষ্টিতে দেখলে PCJSS-এর হাতে আগের মত পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামকে তুলে দেওয়া দরকার। কারণ ভারত এবং আন্তর্জাতিক সাহাস্য ছাড়া পাহাড়ে অধিকার ফিরবে না।

পরিশেষে এইটুকু বলে রাখি, ৩০ বছর PCJSS ছিল কিন্তু এবারের মত শক্তিশালী ছিল না। হঠাৎ করে এই দল এই শক্তি পেল কোথায় সেই ইঙ্গিত যদি UPDF কর্মীদের মাথায় না থাকে কিছু করার নেই।

হ্যাঁ, আমি PCJSS-এর কর্মী নই। UPDF -এর বিরোধী নই। অন্যদের মত তিন দশক আমিও চুপ ছিলাম। হার-জিত নিয়ে কোন টু শব্দ করি নি।

হ্যাঁ, আমিও অন্যসব মানুষের মত সাধারণ একজন মানুষ। আমিও পাহাড়ে জন্মেছি। পাহাড় নিয়ে সাধারণ মানুষের মত ভাবি। কাজেই আমি মনে করি, PCJSS ১০০% সঠিক না হলেও পাহাড়ে এই দল ছাড়া মুক্তি নেই। অস্ত্র সংগ্রামে হোক বা গণতান্ত্রিক সংগ্রামে হোক পাহাড়ের অধিকার আদায়ে এই দলের নিকট পাহাড়ের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া দরকার।

আর যদি নাও হয়, তবে প্রাণহানি ঘটবে। দেরি হলেও UPDF-এর জয়ের সম্ভাবনা একদম নেই বললে চলে।

না, হয়তো ভাবছেন, যে যার দলের অবস্থানে থেকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলবে। আপাতত তা মনে হচ্ছে না। গণতন্ত্রের দেশ থাকি কিন্তু গেরিলা দলে আপাতত গণতন্ত্র নেই। আগে সফলতা তারপর গণতন্ত্র।

জনগণ যত তাড়াতাড়ি এই গ্রামের বালকদের মত “বোদাবুদি”র রায় দিতে পারবে তত পাহাড়ের মঙ্ঘল।

তাই সমীরণ বা ধর্মজ্যোতির হার জিত নিয়ে ভোট বিষয় নয়। এই বিষয়টা পাহাড়ের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে সেটার লড়াই। কেউ না শুনলে হয়তো অঘটনও ঘটে যেতে পারে। তাই আমি মনে করি, সাধারণ মানুষের এখানে ভোটের বিষয়ে নীরব থেকে রায় দেওয়া উচিত।

ইতিহাস সাক্ষী, পাহাড়ে বিভক্ত নেতৃত্ব কখনো আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বিভাজনের সুযোগে সব সময় তৃতীয় পক্ষ শক্তিশালী হয়েছে। আজও সেই ঝুঁকি রয়ে গেছে।

পোস্ট ১: নির্বাচনে সাধারণ মানুষের করণীয়

চুক্তির পর থেকে এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে আলাদা। কিন্তু এই বিষয়টি বেশিরভাগ মানুষের খেয়ালের বাইরে রয়ে গেছে। দেশে যেমন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, তেমনি নির্বাচনেও কেউ আর আইন মানবে—এমন প্রত্যাশা করার সুযোগ নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ। এই নির্বাচন আগে যেমন সেনা-নিয়ন্ত্রিত ছিল, তেমনি এখনো আছে। বরং বলা যায়, এবার তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি আর সাধারণ মানুষের হাতে নেই। বাঙালি জাতীয় দলের প্রার্থী হলে হয়তো সামান্য এদিক-সেদিক হতে পারে—এর বাইরে বাস্তবতা বদলানোর সুযোগ নেই।

নিজের ভোটাধিকার আছে ঠিকই, কিন্তু তা কার্যকর হবে না। তাই পাহাড়ে প্রতিটি সাধারণ আদিবাসীর প্রথম করণীয় হলো নির্বাচনের প্রার্থীদের কোন্দল থেকে নিজেকে দূরে রাখা।

কারণ সমীরণ দেওয়ান কিংবা ধর্মজ্যোতি চাকমা—এই পরিস্থিতিতে কারও জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা নেই। (একটি ভিন্ন উপায় আছে, সেটি পরে লিখবো।)

আর ধরুন, তাদের দুজনের কেউ একজন জিতলেও, তিনি সবার জন্য কিছু করতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। তারা হয়তো আপানাকে চেনেনই না। তারা সবায়কে চাকুরী দিতে পারবেন না। হয়তো কিছুই করতে পারবেন না যা অন্যন্যা প্রার্থীদের আমরা দেখেছি। গুটিকয়েক সুবিদে পেতে পারে।

তাই, আমাদের মত সাধারণ মানুষের বাস্তব লাভ খুব সীমিত। তার চেয়ে বরং জুম চাষ করুন, মাছ ধরুন। আনন্দে থাকুন। বাড়ির যেসব কাজ পড়ে আছে, সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকুন। দেখবেন, আগামী বছরে আপনি অনেক এগিয়ে যাবেন। আর এগিয়ে না গেলেও অন্তত স্বজাতি ভাইদের হুমকি থেকে বেঁচে যাবেন। শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।

নিজে ভেবে দেখুন, এই নির্বাচন আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে আসলে কী দেবে? সামগ্রিক বিষয় আপাতত বাদ দিন। দুর্ঘটনায় নিজের যখন একটি পা ভেঙে যায়, ব্যথা আমি একাই পাই। কেউ সেই ব্যথার ভাগ নেয় না। এই নির্বাচন আসলে সেই রকম একটি দুর্ঘটনার সাথে উল্লেখ করা যায়। ভোটের সময় ভোট দিন যাকে খুশি। তা আমি না দিতে বলছি না।

হ্যাঁ, সামগ্রিক স্বার্থের কথা আপাতত বাদ দিন। সেটা সাধারণ খেতে খাওয়া আমাদের মত মানুষের এই নির্বাচনে ভাবার দরকার নেই।

সামগ্রিক চিন্তা নিয়ে আলাদা পোস্ট লিখবো, সেখানে আরও অনেক ঝট খুলে বলব। আপাতত এটুকুই—কোনো প্রার্থীর হয়ে বা কোনো দলের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে না জড়িয়ে শান্তিতে থাকুন। এবারে অনেক প্রাণহানির আশঙ্কা আছে। এর সঙ্গে বড় কিছু ঘটছে, যা আমরা এখনো পুরোপুরি টের পাচ্ছি না।

আমি সাধারণ জনগণের পক্ষে কথা বলি

Khagrachari election secret disclosed

গরিবের ঘরেই আমার জন্ম। এ নিয়ে আমার কোনো লজ্জা নেই বরং আমি গর্ব করি। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে গরিব মানুষের সংখ্যাই বেশি। আদিবাসীদের মধ্যেও আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ছোটবেলা থেকেই বড়লোকদের প্রতি আমার এক ধরনের বিতৃষ্ণা ছিল। হয়তো স্বর্গীয় যতীন্দ্রলাল চাকমার সান্নিধ্য না পেলে এই বিতৃষ্ণা সেটলার-বিরোধী ঘৃণার মতোই তীব্র আকার নিত। সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য আমি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেছি, তা কেউ আমাকে আলাদা করে শেখাতে পারবে বলে মনে হয় না।

২০২৫ সালেও এসে সেই সাধারণ মানুষ ও বড়লোক, ধনী ও গরিবের শ্রেণিবিভাজন কমেনি। বরং এখন এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট। ধনী হওয়া এখন সহজ। খুব সহজে ধনী হওয়া যায়।

এই ধনী-গরিবের সামাজিক ব্যবধানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত দেশপ্রেমী দলগুলো। ধনী হওয়ার সহজ পথ হলো দল করা। সবাই নিজেকে দেশপ্রেমী, জুম্মপ্রেমী বলে দাবি করে।

কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করে, এত দল, এত জুম্মপ্রেমের দাবি সত্ত্বেও পাহাড়ের এই অবস্থা কেন তাহলে উত্তর আসে, ‘ওদের জন্য’। সব কিছুর জন্য ‘ওরা’ দায়ী। নিজেদের দোষ কেউই দেখতে চায় না।

আমি বরাবরই এই প্রবণতার বিরোধী। নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে ‘ওদের জন্য’ বলে দায় চাপানোর বিরোধী, সেটা যে দলই করুক না কেন। এই কারণেই আমি সব দলের কাছেই বিরোধী।

আসলে আমি সব দলের বিরোধী। কারণ আমি জনগণের পক্ষে। তাই আমার পোস্টগুলোতে সাধারণ মানুষই বেশি সাড়া দেয়।

এখন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে। বরাবরের মতো এবারও সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না—আসলে কী হচ্ছে, কে সত্য কথা বলছে, বিষয়টা কী। দলগুলো সাধারণ মানুষকে নিজেদের মতো করে, নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছে।

আর জাতীয় রাজনীতিতে যারা সম্পৃক্ত, তারা অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। তারা জনগণকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে জনগণের মাথা বিক্রি করে—যেমন আগে ছাগল বাঁধার খুঁটি দেখিয়ে ছাগল বেপারীর কাছে বিক্রি করা হতো। এখন শুধু ছাগলের জায়গায় মানুষ, আর খুঁটির জায়গায় মানুষের মাথা। পার্থক্য এটুকুই। বিনিময়ে মাল আর টাকা—সবই একই।

তাই নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণের কী করা উচিত, তা নিয়ে আমি ধীরে ধীরে লিখব। এই পথে আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ উঠবে—বিক্রি হওয়ার অভিযোগ, গালিগালাজ। তবু সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে সেগুলো মেনে নেব।

তবে এসব লেখা শুরু করার আগে বিনয়ের সঙ্গে, হাত জোড় করে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি আমার বিবেক, আমার কলম, আমার কণ্ঠ কখনো বিক্রি করি না। আগে অভাবের সময়ও করিনি, আর এখন তো সেই প্রশ্নই ওঠে না। পাহাড় থেকে যে সব জুম্ম আজ বিদেশে ভালো আছে বলে মনে হয়, তাদের তালিকা করলে আমার অবস্থান দশ নম্বরের নিচে হবে না।

তাই লেখা বিক্রির অভিযোগ আসার আগেই তার খণ্ডন করে রাখলাম। যারা টাকার জন্য বিক্রি হয়, তাদের টাকা দিয়ে মাপা যায়। কিন্তু আমি আলাদা।

এবার একটু ইঙ্গিত দিই, আমি কোন বিষয়ে লিখতে চাই। নির্বাচনে দেখলে মনে হয় পাহাড়ে বিরাট চারটি দল। কিন্তু আমার মূল্যায়নে বাস্তবে মূলত দুটি শক্তি—বিএনপি ও জামাত। বাকি যাদের চুক্তিপক্ষ ও চুক্তিবিরোধী হিসেবে দেখা হচ্ছে, তারা আসলে নির্বাচনের উপসর্গমাত্র।

এই সবের মাঝখানে আছে জনগণের কষ্ট ও বিভ্রান্তি। সেই বিষয়গুলো নিয়েই পরবর্তী পোস্টগুলো লিখব।

সঙ্গে থাকুন। জনগণের কথাই তুলে ধরব।

নারীকে বাইরে রেখে পাহাড়ের আন্দোলন কতদূর যাবে?

নারীকে বাইরে রেখে পাহাড়ের আন্দোলন কতদূর যাবে?

যে বিপ্লবে নারীদের সম্পৃক্ত করা যায় না, সেই বিপ্লব কখনোই সত্যিকার অর্থে গতিশীল হয় না। পাহাড়ে এই কথাটি আজ নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু আমাদের চিন্তার কাঠামো অনেক জায়গায় এখনো থমকে আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপ্লবের ইতিহাস আজকের নয়। এটি প্রায় শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত। এই দীর্ঘ ইতিহাসে পাহাড়ি আদিবাসী নারীরা শুধু দর্শক ছিল না। তারা বিভিন্নভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল—খাদ্য জোগানো, বার্তা বহন, আশ্রয় দেওয়া, এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামের গল্পও আমরা শুনেছি। শান্তিবাহিনী গঠনের সময় নারী সশস্ত্র কর্মীর কথা লোকমুখে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের উপস্থিতি ছিল সীমিত, দৃশ্যমান ছিল না। হয়তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে, হয়তো তৎকালীন বাস্তবতায় নারীদের সেই জায়গা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় এখন পেরিয়ে গেছে।

আজ পৃথিবী নারী ও পুরুষকে আর আলাদা করে বিচার করে না। শুধু সংখ্যায় নয়, শক্তিতে, মেধায়, সাহসে এবং অধিকারেও তারা সমান। পাহাড়ের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। অনেক জায়গায় নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়েও বেশি। তাহলে এই বিশাল শক্তিকে বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলন কীভাবে সফল হতে পারে? বড় একটি অংশকে উপেক্ষা করে কোনো সংগ্রাম কখনোই পূর্ণতা পায় না—এটা শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব সত্য।

আবেগ থেকে নয় বরং বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে পাহাড়ি নারীরা আন্দোলনে যুক্ত হতে চায়। জমি হারানোর যন্ত্রণা, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবার ভাঙনের ভয়—এসব তারা প্রতিদিন নিজের শরীরে বহন করে। পুরুষের চেয়ে নারীর জীবন পাহাড়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের সংগ্রামে আগ্রহ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো আন্দোলন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।

তবুও পাহাড়ের সমাজ এখনো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নারীদের দুর্বল ভাবা হয়। তাই তাদের আন্দোলনের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীরাও এই সংগ্রামে যুক্ত হতে চায়। একজন পুরুষ যেমন তার জাতি, ভূমি ও অস্তিত্বকে ভালোবাসে, একজন নারীও ঠিক তেমনই ভালোবাসে। তারা আগ্রহ দেখালে তাদের “না” বলা আসলে নৈতিকভাবে সঠিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও দূরদর্শী নয়।

আজ পাহাড়ে আমরা দলের দুর্নাম শুনি—দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার। এগুলো কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয়, এগুলো কাঠামোগত সমস্যা। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুরুষদের একচেটিয়া বলয়ের ভেতরে এসব প্রবণতা সহজে জন্মায়। নারীরা পাশে থাকলে অনেক সময় এই প্রবণতা কমে আসে। কারণ নারীরা শুধু সহানুভূতির প্রতীক নয়, তারা সংযম, জবাবদিহি এবং দায়িত্ববোধের শক্তিশালী উপস্থিতি। সংগ্রামে নারী কর্মীরা অনেক সময় শুধু কাজের শক্তি নয়, বরং সান্ত্বনা ও গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

আরেকটি কঠিন সত্য হলো, নারীদের বাদ পড়ার পেছনে শুধু সমাজ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পুরুষ নেতৃত্বও দায় এড়াতে পারে না। অনেক নারী এগিয়ে আসতে চাইলেও তাদের সামনে রাখা হয় অবিশ্বাস, সন্দেহ আর নীরব ভয়। আন্দোলনে যুক্ত হলে নারীদের চরিত্র নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই সামাজিক শাস্তির ভয় অনেক নারীকেই পেছনে সরিয়ে রাখে। এটা নারীদের দুর্বলতা নয় বরং এটা আন্দোলনের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফল।

কাজ না থাকলে মানুষ বিপথে যায় আর এটা পাহাড়েও সত্য।

আজ প্রশ্ন হচ্ছে, নারীরা কী করবে? আমরা কি তাদের সমাজের কাজে, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার কোনো বাস্তব পথ খুলে দিতে পেরেছি? যদি না পারি, তাহলে তারা যখন ভিন্ন পথ বেছে নেয়, তখন শুধু দোষারোপ করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?

আমরা একই কলেজে পড়েছি, একই ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেছি। আমি পুরুষ বলে রাজনীতি করি, দল করি, নেতা হই। কেউ টাকার জোরে বড় পদে বসি, কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকি, কেউ ব্যবসা, গাড়ি, বাগান আর সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকি, কেউ অস্ত্র ধরে নিজেকে বড় বিপ্লবী বানাই। কিন্তু নারীরা এসবের কোনোটাই সহজে করতে পারে না। তারা ভান্তে হতে পারে না, দল করে নেতা হতে পারে না, আপনার মতো দেশ ছেড়ে পালাতে পারে না, সেনা ক্যাম্পের ছায়ায় বিপ্লবী সাজতে পারে না, বন্দুক হাতে চাঁদা তুলে জীবন চালাতে পারে না।

তাদেরও স্বপ্ন আছে। বড় হওয়ার স্বপ্ন, নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন, একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন। এই স্বপ্নগুলোর জন্য আমরা যদি কোনো সম্মানজনক পথ না রাখি, তাহলে তারা যখন অন্য জাতির পুরুষের হাত ধরে চলে যায়, নামের শেষে আদিবাসীর টাইটল বাদ দিয়ে অন্য টাইটলে পরিচিত হয় তখন আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাই না। আমরা হারাই আমাদের ভবিষ্যতের এক বড় শক্তিকে।

এই নারীরাই আমাদের জন্য ভাত রান্না করতে পারত, জঙ্গলে অসুস্থ হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারত, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার পরিকল্পনার সমান অংশীদার হতে পারত। আমরা যা পারি, তারাও তা পারে। একজন অসুস্থ সৈনিকের পাশে একজন নারী সৈনিকের গুরুত্ব কতটা, তা সৈনিক না হলে বোঝা কঠিন।

বিশ্বে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অনেক সময় একজন পুরুষ সৈনিকের সঙ্গে একজন নারী সৈনিক রাখা হয় যেন মিশন যেন সফল হয়। একজন পুরুষ সহজে একজন নারী সহযোদ্ধাকে ফেলে যায় না, যেমন একজন নারীও সহজে একজন পুরুষ সহযোদ্ধাকে ছেড়ে যায় না। এই বাস্তবতার কারণেই অনেক দেশ, বিশেষ করে ইসরায়েল, এই নীতিকে গুরুত্ব দেয়। এটি কোনো আবেগী ধারণা নয়, এটি পরীক্ষিত কৌশল।

আজ পাহাড়ি কিশোরী মেয়েরা এই আন্দোলনের দিকে তাকিয়ে কী শিখছে, সেটাও আমাদের ভাবা দরকার। তারা কি শিখছে যে এই সংগ্রাম শুধু পুরুষদের জন্য? তারা কি ভাবছে, এখানে আমার কোনো জায়গা নেই? যদি আজ আমরা এই বার্তাই দিই, তাহলে দশ বছর পরে পাহাড়ের আন্দোলন আরও সংকীর্ণ, আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তখন শুধু নারীরা নয়, পুরো একটি প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।

পাহাড়ে বিষয়টি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার নয়।

নারীদের দূরে ঠেলে নয়, কাছে টেনে নিতে হবে। তাদের শুধু সহযোগী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্তের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বিপ্লবকে যদি সত্যিকার অর্থে জীবিত, বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই করতে চাই, তাহলে আজই এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। বিপ্লব সফল করতে হলে নারীদের জায়গা আজই তৈরি করতে হবে—আগামীকালের জন্য নয়, এখনই।