ভীমরাজ না চিনলেও ছবিটা দেখলেই চিনে ফেলবেন। পাহাড়ের আদিবাসীরা একে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন নামে ডাকে। বাংলায় পরিচিত নামগুলোর মধ্যে “ভীমরাজ” একটি।
এই জানেবাজ পাখিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা—সবাই পাখির রাজা বলে জানে। কিন্তু এই রাজত্বের বৈশিষ্ট্য কী? অন্য পাখির কাছ থেকে খাবার কেড়ে খাওয়া। নিজেরা শিকার করে বাঁচে না, চুরি করে বাঁচে। অলসতা এদের স্বভাব।
এই স্বভাবটাই পাহাড়ে বহু আদিবাসী নেতার চরিত্র হয়ে উঠেছে। তারা মনে করে—রাজা মানে সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো খাবার কেড়ে খেয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা।
কিন্তু সত্যিকারের পাখির রাজা কে?
ইগল।
নিজের খাবার নিজেই খুঁজে আনে। কারও খাবার কেড়ে বাঁচে না। শক্তি, সাহস আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক।
তাহলে ভীমরাজ কে?
রাজা নয়—গুণ্ডা পাখি।
আর পাহাড়ে যারা নিজেদের ভীমরাজ ভেবে রাজা সেজে আছে, যারা সাধারণ মানুষের খাবার কেড়ে খেয়ে বেঁচে থাকে—তারা নেতা নয়। তারা গুণ্ডা।
অথচ চড়ুই কত ছোট। তবু কী সুন্দর তার স্বভাব। ঐক্য আছে, সহমর্মিতা আছে। একসঙ্গে থাকে। কারও খাবার না থাকলে ভাগ করে খায়।
এবার মূল কথায় আসি।
একজন সাধারণ মানুষ যখন ১০০ টাকার বিনিময়ে দাঁড়ি-পাল্লার নির্বাচনী প্রচারণায় যায়, শুধু এই আশায় যে সন্ধ্যায় তার পরিবার দুমুঠো নুনভাত খেতে পারবে—তখন সে হয়ে যায় ‘জাতিবিরোধী’।
আর যার গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, নিরাপদ জীবন আছে—সে যখন মাথা দুলিয়ে মিথ্যে আশ্বাস দেয়, ধানের শিষে ভোট চেয়ে জুম্ম জাতির অধিকারের নামে বিভ্রান্তি তৈরি করে—তখন তার সমালোচনা করার কেউ থাকে না। তখন সে হয়ে ওঠে ‘নেতা’।
যখন কেউ সেনানিবাসে বসবাস করে সেনাবাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও না বলে, বরং বিপক্ষের স্বজাতি ভাইয়ের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদগার করে—তখনও সে নেতা।
আর কেউ সরকারের দালানকোঠায় থেকেও সরকারের বিরুদ্ধে নীরব থাকে, অথচ নিজেকে বিপ্লবী নেতা বলে পরিচয় দেয়—তখন জনগণ যাবে কোথায়?
মানুষ তো দিশেহারা হবেই।
তখন যার যা ইচ্ছে তা করবে। নেতাদের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মাবে। কেউ হোটেলে দেহ বিক্রি করবে। কেউ চীনে গিয়ে নিজেকে বিক্রি করবে। কেউ সমুদ্র পাড়ে গিয়ে নিজেকে বাঙালির হাতে তুলে দেবে। উপায় তো আর থাকে না।
কখনো ভেবে দেখেছেন, কতটা অসহায় হলে একজন নারী নিজের সম্মান বিসর্জন দেয়? কতটা অসহায় হলে একজন নারী বিদেশির কাছে নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়?
এই অসহায়তা বোঝার ক্ষমতা আপনাদের নেই।
মানুষ জঙ্গলে আলু বিক্রি করলে আপনারা একভাগ পান। হাজারো মানুষের রক্তের টাকায় আপনারা ভালো থাকেন। সেই রক্তক্ষরণের ওপর দাঁড়িয়ে আপনাদের ছেলে-মেয়েরা বিদেশে পড়ে।
আর যারা রক্ত পানি করে আপনাদের এই টাকা জোগায়, তাদের সন্তানরা বছরে একটি পছন্দের পোশাকও কিনতে পারে না।
এই ভীমরাজ নীতির জন্য আপনাদের ধিক্কার।
পাহাড়ে যেসব দৃশ্য আজ হঠাৎ চোখে পড়ছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো বহুদিন ধরে জমে থাকা এক সামাজিক বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ।
বাইরে থেকে মনে হতে পারে মানুষ বদলে গেছে। কিন্তু ভেতর থেকে দেখলে বোঝা যায় পাহাড়ের নীতিই মানুষকে বদলাতে বাধ্য করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে একটি নীরব বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে—নিজের পরিচয়, নিজের মানুষ, নিজের সমাজ টিকে থাকার নিশ্চয়তা নয়। টিকে থাকতে হলে অন্য কিছু ধরতে হবে।
এই বার্তাটা প্রথম গ্রহণ করেছে যারা সুযোগের কাছাকাছি ছিল—শহরে থাকা, শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মানুষরা। তারাই দেখিয়েছে, সুবিধা পেতে গেলে অবস্থান বদলানো দোষের নয়।
ফলে গ্রাম, দুর্গম এলাকা আর চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষদের সামনে নৈতিকতার বিলাসিতা আর থাকে না। তারা দেখে—যারা আগে পথ দেখাত, তারাই এখন দরকষাকষির অংশ।
বিশ্বাস ভেঙে যায়। আর সেই শূন্যতায় ঢুকে পড়ে যে কোনো শক্তিশালী প্রভাব।
পাহাড়ে যে জনসমাগম দেখা যায়, তা অনেক সময় আদর্শের কারণে নয়—প্রয়োজনের কারণে। এটা বিশ্বাসের গল্প নয়, বেঁচে থাকার গল্প। এখানে মানুষ প্রশ্ন করে না, “এটা ঠিক না ভুল”—প্রশ্ন করে, “এতে আজকের দিনটা যাবে তো?”
সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্য হলো এই প্রক্রিয়ায় কাউকে একা দায়ী করা যায় না। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দায় ছড়িয়ে গেছে। নেতৃত্ব দিয়েছে সুবিধাভোগীরা, অনুসরণ করেছে অসহায়রা। মাঝখানে হারিয়ে গেছে সমাজ, হারিয়ে গেছে পরিচয়ের ভারসাম্য।
শেষ পর্যন্ত পাহাড় আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্য হচ্ছে যখন অর্থ আর সুযোগই একমাত্র নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষ আদর্শ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় না।
তখন বিক্রি হওয়াটা চরিত্রের ব্যর্থতা নয় বরং নীতি হয়ে ওঠে। দল, নেতারা যা বলে তার বিপরীতে যাবে। কারণ তারা আর ভীমরাজ পাখির কাছে খাবার হারাতে চায় না।
তাই ভীমরাজ হয়ে রাজা সাজার চেষ্টা নয় বরং চড়ুই হওয়ার চেষ্টা করুন।
নইলে পাহাড়ে আদিবাসী অস্তিত্ব থাকবে না। মানুষ আরো বেপরোয়া হবে।
⸻


